আই জামান চমক, icrbd24: তিস্তার জল যেখানে মাটির বুক ছুঁয়ে যায়, সেই ডিমলা উপজেলায় আমি বহুবার গিয়েছি। কাজের প্রয়োজনে, কখনো নিছক টানে, কখনো দাওয়াত খেতে। নীলফামারীর এই জনপদের সঙ্গে আমার একটা পুরনো সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে বছরের পর বছর ধরে। মানুষ চেনার সম্পর্ক। মাটির গন্ধ চেনার সম্পর্ক।
সেই ডিমলাতেই সাংবাদিক জাহাঙ্গীর ভাই একদিন পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন মহব্বত নামের এক ব্যতিক্রমী মানুষের সঙ্গে। নাম যেমন, মানুষটাও তেমন। ভালোবাসা আর আন্তরিকতা তিনি কতটা ধরে রাখতে পারেন, সেটা টের পেয়েছিলাম যেদিন আমি আর এবিএম সোহেল রশিদ স্যার গিয়েছিলাম ডালিয়ার তিস্তা ব্যারাজ পরিদর্শনে। সেদিনের আতিথেয়তা এখনো আমাদের হৃদয়ে অমলিন হয়ে আছে। কিছু কিছু দিন এমনই হয়। ফিরে আসা যায় না তাদের কাছে, তবু তারা ফিরে আসে বারবার, স্মৃতির ভেতর দিয়ে।
সেই একই মাটিতে, আইসিআরবিডি টোয়েন্টিফোরের হাত ধরে সাংবাদিকতার মতো একটা মহান অথচ কঠিন পেশায় নতুন করে পা রাখলেন একজন নারী। নাম তার রাহেনা বারী আয়না। প্রতিবাদী, ব্যতিক্রমী। ব্যক্তিগতভাবে তার সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না, এখনো খুব গভীর নয়। কিন্তু তার পাঠানো দুটি সংবাদ আমি নিজে সম্পাদনা করেছি। আর সেই দুটো লেখাতেই বোঝা গেছে, অনিয়মের বিরুদ্ধে তার সত্তা কতটা সোচ্চার হতে জানে।
তার ফেসবুক পেজের বায়োতে লেখা আছে একটা ছোট্ট পরিচয়। আমি রাহেনা বারী আয়না। সাংবাদিকতা আমার হবি। মাস্টার্স অফ সোশ্যাল সায়েন্স। সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ আপনাকে। এই কটা লাইনই যেন অনেক কথা বলে দেয়। বিনয় আছে, দাবি নেই। শখ বলে যে পেশাকে মেনে নিচ্ছেন, সেটাই একদিন হয়তো তার ধ্যান হয়ে উঠবে। এমনটাই দেখেছি আমি বহুবার।
দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে দেশজুড়ে প্রায় চারশোর বেশি সংবাদকর্মী তৈরি হয়েছেন আমার হাত ধরে। তাদের অনেকেই এখন দেশের প্রথম সারির গণমাধ্যমে কাজ করছেন সুনামের সঙ্গে। কেউ কেউ পৌঁছে গেছেন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও। এই দীর্ঘ পথচলার অভিজ্ঞতা থেকে একটা জিনিস আমি বুঝি। কার গন্তব্য কোথায়, সেটা শুরুর দিকেই কিছুটা টের পাওয়া যায়। রাহেনা বারী আয়নার লেখার ধরন, কাজের ধরন দেখে মনে হয়, তার মননে এবং চেতনায় সাংবাদিকতা কোনো ভাসা ভাসা শখ নয়। কলম আর ক্যামেরা যেন সমাজের আয়না হয়েই কাজ করে, এই প্রত্যাশা করা যায়। নামের সঙ্গে যেন কাজেরও মিল থাকে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার লিখেছিলেন, সংবাদপত্র যতই অধিক ও অবাধ হইবে, স্বাভাবিক নিয়ম অনুসারে দেশ ততই আত্মগোপন করিতে পারিবে না। কথাটা শুধু পত্রিকার সংখ্যা নিয়ে নয়। কথাটা মানুষ নিয়ে। যত বেশি যোগ্য, সৎ ও সাহসী মানুষ এই পেশায় আসবে, দেশ ততই লুকিয়ে থাকার জায়গা হারাবে। অন্যায় আড়াল করার জায়গা কমে আসবে। এইটুকু বিশ্বাস নিয়েই আমি এই পেশায় ষোলো বছর পার করে দিয়েছি।
কিন্তু রাহেনা বারী আয়না নিশ্চয়ই জানেন, এই পথ ফুলে ঢাকা নয়। সাংবাদিকতার মতো মহান পেশায় যুক্ত হওয়াটা শুধু রোমাঞ্চের বিষয় নয়। পদে পদে ঝুঁকি এখানে। হুমকি, ধমক, এসব এই পেশার নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়ায় একসময়। লোভের হাতছানি আসে চুপিসারে। অপশক্তির রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই হাঁটতে হয় সামনের দিকে। আর সবচেয়ে কঠিন লড়াইটা হয়তো বাইরের শত্রুর সঙ্গে নয়, নিজের পাশে বসে থাকা কিছু ঈর্ষান্বিত সহকর্মীর সঙ্গে। এই সত্যিটা যত দ্রুত মেনে নেওয়া যায়, পথচলা ততই সহজ হয়।
কাজী নজরুল ইসলাম লিখে গিয়েছিলেন, বল বীর, বল উন্নত মম শির। সেই কথাটা মনে পড়ে যখন দেখি কোনো তরুণ বা তরুণী নিজের এলাকায়, নিজের মাটিতে দাঁড়িয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরার সাহস দেখান। মাথা উঁচু রাখাটা কথায় সহজ, বাস্তবে ভীষণ কঠিন। বিশেষত যখন চারপাশে চেনা মুখগুলোই কখনো কখনো প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে।
আমি নিশ্চিত নই আয়না ঠিক কোন পথে হাঁটবেন সামনে। কেউই তা নিশ্চিত করে বলতে পারে না। তবু একটা বিশ্বাস কাজ করে। যে মানুষ নিজের পরিচয়ে বিনয়ী, কাজে সাহসী, তার গন্তব্য সহজে থমকে যায় না। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই একজন গুণী সাংবাদিক হিসেবে সমাদৃত হবেন, এই বিশ্বাসটুকু আমি রাখতে চাই।
তার পথচলা মসৃণ হোক। সংবাদকর্মী হিসেবে এই যাত্রা সফল হোক। তার অবদানে ধন্য হোক তিস্তার জল ছুঁয়ে যাওয়া উপজেলা ডিমলা, ধন্য হোক গোটা নীলফামারী জেলা। শুভ হোক এই যাত্রা। সফল হোন তিনি, নিজের সত্তার মতোই, একটা সমাজের আয়না হয়ে।
লেখক: সাংবাদিক, কবি, কথাসাহিত্যিক, কলামিষ্ট, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী।
হোয়াটসঅ্যাপ: 01718456839