রাজধানীর হাজারীবাগ, নবাবগঞ্জ বাজার ও সেকশন ঢালসহ আশপাশের এলাকায় গড়ে ওঠা একটি ভয়াবহ মাদক নেটওয়ার্ককে কেন্দ্র করে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি অনুযায়ী, নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দেওয়া রাজেশ গনি এবং নিখিল ওরফে সোহেল নামের দুই ব্যক্তি এই পুরো এলাকার মাদক ব্যবসার একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন। দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা, ফেনসিডিল ও গাঁজার অবৈধ কারবার পরিচালনার পেছনে তাদের মূল শক্তি হিসেবে কাজ করছে রাজনৈতিক প্রভাব, স্থানীয় অপরাধী চক্র এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একশ্রেণীর অসাধু সদস্যের সাথে তাদের কথিত যোগাযোগ।
এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে এবং অনুসন্ধানী সূত্রে জানা গেছে, রাজেশ গনি তার প্রভাব বিস্তারের জন্য বিভিন্ন সময়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সাথে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখে চলেছেন। অতীতে সাবেক সংসদ সদস্য নিক্সন চৌধুরী এবং হাজী সেলিমের মতো বিতর্কিত আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে রাজেশের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের স্পষ্ট প্রমাণ ছিল। তবে পটপরিবর্তনের পর বর্তমান প্রেক্ষাপটে নিজের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও মাদক সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে কৌশল বদল করেছেন তিনি। নিজেকে বিএনপি সমর্থক হিসেবে জাহির করার অপচেষ্টায় সাম্প্রতিক সময়ে রাজেশ বিএনপি নেতা ও সাবেক ঢাকা কলেজ ভিপি আলী নেওয়াজের সাথে ভিড়ে যাওয়ার নানা চেষ্টা চালাচ্ছেন। স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, এলাকায় নিজের একক প্রভাব ধরে রাখতে এবং মাদক ব্যবসা নিরবচ্ছিন্নভাবে চালাতে রাজেশ প্রতিনিয়ত আলী নেওয়াজের নাম ব্যবহার করে চলেছেন।
অন্যদিকে, রাজেশের অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী নিখিল ওরফে সোহেল হাজারীবাগ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের কথিত সোর্স হিসেবে কাজ করে আসছেন। গত জুলাই ও আগস্ট মাসের তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় নিখিল সরাসরি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের হয়ে মাঠে সক্রিয় ছিলেন। সে সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্রসমাজ ও ছাত্রদলের মিছিলে নৃশংস হামলায় তার সরাসরি যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। গত ৫ আগস্টের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিখিল কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকলেও পরবর্তীতে রাজেশের সরাসরি সহায়তায় পুনরায় এলাকায় ফিরে আসেন এবং আবারো পুলিশের সোর্স হিসেবে নিজের পুরনো অবস্থান পুনরুদ্ধার করেন।
নিখিলের এই বিতর্কিত ভূমিকাকে ঘিরে স্থানীয় অধিবাসীদের মনে নানা প্রশ্ন ও ভীতি কাজ করছে। অভিযোগ উঠেছে, পুলিশের সাথে সোর্স হিসেবে যে যোগাযোগের সুবিধা নিখিল পান, সেটিকে ব্যবহার করে তিনি মূলত নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার করান অথবা শায়েস্তা করেন। আবার অন্যদিকে মোটা অঙ্কের সুবিধা নিয়ে অনেক চিহ্নিত অপরাধীকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর থেকে আড়াল করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, হাজারীবাগের এই পুরো অঞ্চলে কোন মাদক ব্যবসায়ী টিকবে আর কে গ্রেফতার হবে, তা বহুলাংশে নির্ধারণ করে দেন এই রাজেশ ও নিখিল জুটি। এই বিষয়ে হাজারীবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তার কোনো আনুষ্ঠানিক মতামত পাওয়া যায়নি।
রাজেশ ও নিখিল চক্রের এই বিস্তৃত মাদক নেটওয়ার্কের মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একাধিক বিশ্বস্ত সহযোগী রয়েছে। হাজারীবাগের স্থানীয় অধিবাসীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, শাহজাহান আলী, স্বপন এবং কালা মানিক নামের তিন ব্যক্তি মূলত রাজেশ ও নিখিলের হয়ে এই গোটা এলাকায় মাদকের কেনাবেচা ও সরবরাহের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। এই চক্রের ভয়াবহ থাবা হাজারীবাগ অতিক্রম করে নবাবগঞ্জ বাজার এবং সেকশন ঢাল সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে, যা স্থানীয় যুবসমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
অনুসন্ধানে এই চক্রের সাথে কিশোর গ্যাংয়ের ভয়াবহ সম্পর্কের চিত্রও ফুটে উঠেছে। স্থানীয়ভাবে ‘ডন সাগর’ নামে পরিচিত এক কিশোর গ্যাং সদস্যের সাথে রাজেশ-নিখিল নেটওয়ার্কের প্রত্যক্ষ যোগাযোগের জোরালো অভিযোগ পাওয়া গেছে। সাগরের এক নিকটাত্মীয়ের সাথে কথা বললে তিনি জানান, ছেলেটি অতীতে একজন সাধারণ ও মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল। কিন্তু বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে নানা প্রলোভনে পড়ে সে অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়ে। সেই স্বজনের সুস্পষ্ট অভিযোগ, রাজেশ ও নিখিল এই কিশোরকে তাদের মাদকের সরবরাহে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন। তবে পরবর্তীতে ইয়াবা ও গাঁজা ব্যবসার মূল নিয়ন্ত্রণ ও লভ্যাংশ ভাগাভাগি নিয়ে তাদের মধ্যে মারাত্মক বিরোধের সৃষ্টি হয়। সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটলে রাজেশ ও নিখিল কৌশল বদলে নিজেদের পুলিশি যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে পরিকল্পিতভাবে সাগরকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার করান বলে তার পরিবারের দাবি।
হাজারীবাগ ও লালবাগ অঞ্চলে রাজেশের স্থাবর সম্পত্তির বিবরণও উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, অসাধু উপায়ে উপার্জিত বিপুল অর্থ দিয়ে লালবাগ ও হাজারীবাগ এলাকায় রাজেশের অন্তত পাঁচটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে। বিশাল আর্থিক সম্পত্তি ও স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে অপরাধ জগতে নিজের আধিপত্য টিকিয়ে রেখেছেন। নিক্সন চৌধুরীর সাথে পূর্বে গড়ে ওঠা ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সুবাদে রাজেশ দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার সাথেও এক ধরণের যোগাযোগ তৈরি করতে সক্ষম হন, কারণ ইত্তেফাকের বর্তমান মালিক নিক্সন চৌধুরীর স্ত্রী। সাংবাদিকতার পরিচয়কে রাজেশ মূলত নিজের অপরাধের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
হাজারীবাগ ও সংলগ্ন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার সাধারণ বাসিন্দা এবং অভিভাবকেরা এখন চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। রাজেশ ও নিখিলকে ঘিরে আসা এই চাঞ্চল্যকর তথ্যগুলো একটি বড় ধরণের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় বছরের পর বছর ধরে এমন মাদক নেটওয়ার্ক কীভাবে সক্রিয় থাকে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সোর্স ব্যবস্থা বা রাজনৈতিক প্রভাবকে অপরাধের সুরক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করার বিরুদ্ধে কেন কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না, তা নিয়ে নানা ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। হাজারীবাগ, নবাবগঞ্জ বাজার ও সেকশন ঢালের অধিবাসীরা এই শক্তিশালী মাদক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত আইনগত ব্যবস্থার জোর দাবি জানিয়েছেন। তারা ইয়াবা, ফেনসিডিল ও গাঁজার অবৈধ কারবার বন্ধের পাশাপাশি পুলিশের সোর্স ব্যবস্থার অপব্যবহার এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক সুরক্ষা দেওয়ার সমস্ত অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত চান।