1. info2@icrbd24.com : বার্তা বিভাগ : বার্তা বিভাগ
  2. admin@icrbd24.com : admin :
বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৩০ অপরাহ্ন

আমি কবি: অভিমানই আমার অহংকার

আই জামান চমক, ঢাকা
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬

আই জামান চমক, icrbd24: রাত গভীর হলে কখনো কখনো মানুষ নিজের ভেতরে ডুব দেয়। সেই ডুবে নানা কথা ভাসে। কত কথা, কত মুখ, কত মুহূর্ত। আমিও দিই। আর তখন বুকের কোথাও একটা চিনচিনে ব্যথা জেগে ওঠে, যার নাম দেওয়া কঠিন। অপমান? হয়তো। তবে শুধু অপমান নয়। অবমূল্যায়ন। নিজেকে তুচ্ছ ভাবা হয়েছে এই বোধ। এই বোধটুকুই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।

আমি কবি। দারিদ্র্যতা আমাকে ভাঙেনি কখনো। ভাঙেনি বলাটা ঠিক নয়, বলা ভালো, দারিদ্র্যকে আমি বরণ করে নিয়েছি আনন্দের সঙ্গে। রিক্ততার ভেতরেও একটা সৌন্দর্য আছে, সেটা কবিরা জানে। ফাঁকা থালায় চাঁদের আলো পড়লে সেখানেও জ্যোৎস্না হয়। কিন্তু অপমান? না। সেটা নেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। কখনো হয়নি, হবেও না।

মহাকবি ফেরদৌসির কথা মনে আসে। তিন দশক ধরে ষাট হাজার দ্বিপদী শ্লোকে শাহনামা লিখেছিলেন তিনি। প্রতিটি শ্লোকের জন্য একটি স্বর্ণমুদ্রার প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু সুলতান মাহমুদ যখন সেই মহাকাব্য হাতে পেলেন, তখন দরবারের বিষধর সভাসদদের কানপড়া আর ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পড়ে পাঠালেন রৌপ্যমুদ্রা। স্বর্ণের বদলে রৌপ্য। পুরস্কারের বদলে অপমান।

ফেরদৌসি সেই মুহূর্তে যা করলেন, তা শুধু কবির কাজ নয়, মানুষের সংহতির ইতিহাস। হাম্মাম থেকে বেরিয়ে সেই রৌপ্যমুদ্রা ভাগ করে দিলেন পরিচারক আর শরবত বিক্রেতাকে। তাচ্ছিল্যের সঙ্গে। যে অর্থে সম্মান নেই, সে অর্থ রাখার কী দরকার? এই প্রশ্নটা আমিও নিজেকে করি। বারবার।

বিদ্রোহী কবি নজরুল বলেছিলেন, আমি চিরতরে দূরে চলে যাব, তবু আমারে দেব না ভুলিতে। এই কথাটা যখন পড়ি, বুকের ভেতর কী একটা নড়ে ওঠে। যাওয়াটা পরাজয় নয়। মাঝে মাঝে চলে যাওয়াই একমাত্র সম্মানজনক উত্তর। থেকে থেকে নিজেকে ছোট করার চেয়ে দূরে সরে যাওয়া অনেক বড়।

আমার একটা দোষ আছে। বারবার একই ভুল করি। যারা বই পড়ে না, যারা জ্ঞানের কথা বোঝে না, যারা কোনো জ্ঞানীর কথা শুনতে চায় না, তাদের কাছে গিয়ে বুদ্ধি দেওয়ার চেষ্টা করি। ফলাফল? প্রতিবার একই। আঘাত খেয়ে ফিরে আসা। তবু আশা যায় না। হয়তো এটাই কবির অভিশাপ। অন্ধকারে আলো জ্বালানোর বৃথা চেষ্টা ছাড়তে পারে না।

কিন্তু এখন আমি বুঝি, এই বোঝাপড়া দেরিতে হলেও হয়েছে যে, যে যুদ্ধে মেধাকে মূল্য দেওয়া হয় না, সে যুদ্ধে নামা মানেই পরাজয় নিশ্চিত করা। পেশীশক্তি যেখানে সত্যকে চাপা দেয়, যোগ্যতাকে পিষে ফেলে, সেখানে কবির কলম নিয়ে দাঁড়ানো বীরত্ব নয়, নির্বুদ্ধিতা। আমি কবি, আমি পড়তে পারি ভবিষ্যৎ। তাই পরাজয় জেনে যুদ্ধে নামি না।

একাকীত্ব আমার পুরনো সঙ্গী। অনেকে মনে করে একাকী থাকা দুর্বলতা। আমার কাছে এটা সম্পদ। যে মানুষ নিজের সঙ্গে থাকতে পারে, সে আসলে সবচেয়ে শক্তিশালী। ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া সহজ, নিজের ভেতরে থেকে নিজেকে চেনা কঠিন। আমি সেই কঠিন পথেই হাঁটি।

অভিমান মানুষ দেখতে পায় না। ভাবে, এই মানুষটা অহংকারী। না। অহংকার আর অভিমানের ফারাক বোঝে কজন? অহংকারী মানুষ নিজেকে বড় মনে করে অন্যকে ছোট করে। আর অভিমানী মানুষ শুধু নিজের সম্মানটুকু আঁকড়ে থাকে। এই সম্মান টাকায় কেনা যায় না, ক্ষমতায় কেড়ে নেওয়া যায় না। এটা থাকে, এটাই থাকে।

ফেরদৌসির মৃত্যুর পর সুলতান মাহমুদের যখন বোধোদয় হলো, তখন স্বর্ণভরা উট পাঠিয়েছিলেন তুসে। সেই উটের কাফেলা শহরে ঢুকছিল এক দরজা দিয়ে, আর অন্য দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল কবির শবযাত্রা। কবির কন্যা সেই স্বর্ণ ফিরিয়ে দিলেন। বললেন, যে সম্মান জীবদ্দশায় এলো না, তা মৃত্যুর পরে নেওয়া পিতার অপমান।

এই ঘটনা যখন পড়ি, একটাই কথা মাথায় আসে। সময়ের মূল্য আছে। সম্মানের সময় আছে। পরে দিলে হয় না।

আমিও তেমনই। এখন যারা আমার মূল্য বোঝে না, পরে যখন বুঝবে, তখন হয়তো আমি থাকব না। কিংবা থাকলেও সেই স্বর্ণ নেওয়ার ইচ্ছা থাকবে না। কারণ অভিমানই আমার অহংকার। আর সেই অহংকার বেচার জন্য নয়।

যাওয়ার কথা ভাবি। দূরে, অনেক দূরে। কিন্তু কবিতা তো পিছু ছাড়ে না। মানুষের কথা পিছু ছাড়ে না। এই মাটির গন্ধ পিছু ছাড়ে না। তাই যাই না। থাকি। একা থাকি। নিজের সঙ্গে থাকি। এটুকুই যথেষ্ট।

লেখক: সাংবাদিক, কবি, কথাসাহিত্যিক, কলামিষ্ট, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী। হোয়াটসঅ্যাপ: 01718456839

Please Share This Post in Your Social Media

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর
All rights reserved © 2013- 2026