1. info2@icrbd24.com : বার্তা বিভাগ : বার্তা বিভাগ
  2. admin@icrbd24.com : admin :
বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:০৯ পূর্বাহ্ন

একটি কণ্ঠ নিভল, একটি কণ্ঠ লড়ছে

আই জামান চমক, ঢাকা
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬

আই জামান চমক, icrbd24: রাতের শেষ প্রহরে যখন ঘুম আসে না, তখন কানে বাজে কিছু কণ্ঠস্বর। বছরের পর বছর জমানো, স্মৃতির তাকে সাজানো। কিছু কণ্ঠ আছে যা একবার শুনলে ভোলা যায় না। মাটির গভীর থেকে উঠে আসা, শিকড়ের মতো। মুস্তফা জামান আব্বাসী সেরকমই একটি কণ্ঠ ছিলেন। ছিলেন বলতে বুক কেঁপে ওঠে। তবু বলতে হয় — ছিলেন।

তিনি চলে গেছেন।

এই কথাটুকু লিখতে হাত থামছে। কারণ কিছু মানুষ চলে গেলেও ‘চলে যাওয়া’র বিশ্বাস আসে না সহজে। মুস্তফা জামান আব্বাসী তাঁদেরই একজন। বাংলা আবৃত্তিকে যিনি শুধু মঞ্চের শিল্প হিসেবে নয়, একটি দর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। কবিতার কথাকে শরীরে, নিঃশ্বাসে, থামায় মিশিয়ে এমনভাবে উপস্থাপন করতেন যে পাঠক আর শ্রোতার ভেদরেখা মিলিয়ে যেত। বাংলাদেশে বাচিক শিল্পের আধুনিক ইতিহাস লিখতে গেলে তাঁর নাম এড়ানোর উপায় নেই। একুশে পদক শুধু একটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে যে আসন তিনি তৈরি করেছিলেন, তার কোনো পদক হয় না।

আমি তাঁর পাশে বসেছিলাম একটি অনুষ্ঠানে। ক্যামেরার সামনে, বেলুনের রঙিন আলোয়। বাঁয়ে তিনি, মাঝে কবি আল মুজাহিদী, আর ডানে আমি — এক অর্বাচীন সাংবাদিক। সেই মুহূর্তটি মনে পড়লে এখন অদ্ভুত এক অনুভূতি হয়। যেন জানা ছিল না এই ছবিটা কতটা মূল্যবান হবে একদিন। মানুষ বেঁচে থাকতে তার মূল্য বোঝে না। চলে গেলে হিসাবটা সাধারণত মেলানো হয় — দেরিতে, অনুতাপের সাথে।

আর আল মুজাহিদী। মৃত্তিকার কবি। আইসিউর নিষ্ঠুর আলোয় এখন শুয়ে আছেন যিনি, তিনি সারাজীবন লিখেছেন মাটির কথা, শিকড়ের কথা, এই ভূমির সাথে মানুষের গভীর সম্পর্কের কথা। তাঁর কবিতায় বাংলাদেশের গ্রাম আছে, মেঘের গায়ে মিশে যাওয়া দিগন্ত আছে, ধানের শীষে রোদের খেলা আছে। একুশে পদক তাঁর অবদানের সামান্য স্বীকৃতি মাত্র। এই মুহূর্তে যন্ত্রপাতির ঘেরে শুয়ে থাকা মানুষটির জন্য বুকের ভেতর একটাই প্রার্থনা উঠে আসছে — ফিরে আসুন। আপনার কলম থামলে অনেক কিছু থামে।

রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, মৃত্যু নেই তার, মরে যে মানুষের মনে বাঁচে। কথাটা সান্ত্বনার জন্য বলা হয়, কিন্তু ভেতরে একটা তিক্ততাও থাকে। কারণ বেঁচে থাকা মানুষের উষ্ণতার বিকল্প কোনো স্মৃতি হয় না। আব্বাসী সাহেবের হাসি, তাঁর কথা বলার ভঙ্গি, তাঁর সেই গভীর কণ্ঠের অনুরণন — এগুলো আর সশরীরে পাওয়া যাবে না। এই সত্যটা মানতে সময় লাগে। হয়তো লাগাটাই স্বাভাবিক।

আমরা যারা সংস্কৃতির পথে হাঁটি, কবিতা পড়ি, মঞ্চে দাঁড়াই, কলম ধরি — আমাদের প্রজন্মের সামনে এই দুজন মানুষ ছিলেন দিকচিহ্নের মতো। কোথায় যেতে হবে, কীভাবে বলতে হবে, শব্দের সাথে কীভাবে সৎ থাকতে হবে — এই শিক্ষা তাঁদের জীবন থেকে নেওয়া সম্ভব ছিল। এখন একজন নেই, একজন লড়ছেন। এই শূন্যতা কে পূরণ করবে, জানি না। হয়তো পূরণ হওয়ার নয়।

কিন্তু যাঁরা আছেন, তাঁদের ঋণ শোধ করার একটাই পথ — বাঁচিয়ে রাখা। লেখায়, কণ্ঠে, স্মরণে। মুস্তফা জামান আব্বাসীর শেখানো পথে আবৃত্তি করা, আল মুজাহিদীর কবিতার লাইন মুখে মুখে ফেরানো। প্রতিটি মঞ্চে, প্রতিটি অনুষ্ঠানে এই নামগুলো উচ্চারণ করা — ভুলে যাওয়া থেকে বাঁচানোর এই একটাই পথ আমাদের জানা।

কবি আল মুজাহিদীর জন্য আজ শুধু একটাই কামনা — সুস্থ হয়ে উঠুন। আইসিউর দরজা পেরিয়ে আলোয় ফিরে আসুন। আপনার মাটির কবিতার এখনো অনেক কাজ বাকি। আপনার পাঠক অপেক্ষা করছে।

আর আব্বাসী সাহেব — আপনি তো থাকবেনই। প্রতিটি আবৃত্তির মঞ্চে, প্রতিটি শব্দের মধ্যে, প্রতিটি নিঃশ্বাসের বিরতিতে। কণ্ঠ থামে, কিন্তু কণ্ঠের ভেতর যে স্বপ্ন থাকে — তা থামে না কখনো।

লেখক: সাংবাদিক, কবি, কথাসাহিত্যিক, কলামিষ্ট, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী। হোয়াটসঅ্যাপ: 01718456839।

Please Share This Post in Your Social Media

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর
All rights reserved © 2013- 2026