1. info2@icrbd24.com : বার্তা বিভাগ : বার্তা বিভাগ
  2. admin@icrbd24.com : admin :
বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০০ অপরাহ্ন

জুবিন গর্গ: রাজা চলে গেছেন, তবু রাজত্ব আছে

আই জামান চমক, ঢাকা
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬

আই জামান চমক, icrbd24: ব্রহ্মপুত্র কখনো কাঁদে না। অন্তত কাঁদতে দেখা যায় না। এত জল বুকে নিয়ে, এত ঢেউ বুকে চাপা দিয়ে সে শুধু বয়ে চলে — আসাম থেকে বাংলাদেশ, পাহাড় থেকে সমতল, জীবন থেকে বিলীনতার দিকে। কিন্তু জুবিন গর্গের গান যেদিন থেমে গেল, মনে হয়েছিল সেই নদীও একটু হোঁচট খেয়েছে। একটু থমকে দাঁড়িয়েছে। তারপর আবার বয়েছে। কারণ নদী জানে — কিছু কণ্ঠস্বর নদীর মতোই, মরে না।

কয়েকদিন আগে একটা মন্তব্য চোখে পড়ল। ইউটিউবে জুবিন দার স্টেজ শোর ভিডিওর নিচে। একজন লিখেছেন, চার পাঁচদিন ধরে মাথা ব্যথা তার, তবু মোবাইল ছাড়তে পারছেন না। জুবিনের গান টেনে রাখছে। আর সবচেয়ে অদ্ভুত কথাটা তিনি লিখেছেন — উনার মৃত্যুর পরই প্রথম উনাকে দেখলাম। জীবদ্দশায় চিনতাম না।

এইখানে এসে থামি। দীর্ঘশ্বাসের মতো থামি।

কতজন আছেন এই পৃথিবীতে, যাঁদের আমরা চিনি মৃত্যুর পর? কতজন শিল্পীকে আমরা খুঁজে পাই যখন তাঁরা আর নেই? এটা কি আমাদের ব্যর্থতা? নাকি শিল্পের এক অদ্ভুত নিয়তি — যে শিল্প সত্যিকারের, সে মৃত্যুর পরেও পথ খোঁজে নেয় মানুষের কাছে?

আসামের রাজা বলা হতো তাঁকে। কিন্তু জুবিন গর্গ নিজেই একবার সাংবাদিকদের সামনে বুক ঠুকে বলেছিলেন — ভারত সরকার আমাকে কী স্বীকৃতি দেবে? আমিই তো সব দিয়েছি। ঘর দিয়েছি। তেল দিয়েছি। সার দিয়েছি। রাইনো দিয়েছি। জুবিন গর্গকে দিয়েছি। এই কথাগুলো পড়লে প্রথমে মনে হতে পারে অহংকার। কিন্তু একটু ভেবে দেখুন — যে মানুষ নিজের পুরো জীবনটাই এক মাটির কাছে সমর্পণ করেছেন, তাঁর এই কথা কি অহংকার, নাকি সত্য উচ্চারণ?

রাজার মুকুট থাকে সোনায়, কিন্তু জুবিনের মুকুট ছিল সুরে। আর সেই সুর তিনি কখনো মুম্বাইয়ের বাজারে বিক্রি করতে যাননি। বলেছিলেন স্পষ্ট করেই — আমি আসামের রাজা। রাজা কখনো রাজ্য ছেড়ে মুম্বাই বা দুবাই যায় না। মুম্বাইয়ে কোনো রাজা নেই। এই একটা বাক্য — মুম্বাইয়ে কোনো রাজা নেই। কত সহজে বলেছেন। কত গভীরে গিয়ে বুঝেছেন নিজেকে। বলিউডের চকচকে আলো যখন শত শিল্পীকে টেনে নিয়ে যায়, তখন এই মানুষটা পাহাড় আর নদীর কাছে থেকে গেছেন। ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে গান গেয়েছেন।

আর একটা কথা বলেছিলেন তিনি। ভবিষ্যদ্বাণীর মতো। বলেছিলেন — আমি মারা গেলে আসাম তিনদিনের জন্য থমকে যাবে।

আমরা দেখলাম।

তিনদিন নয় — সাতদিন। সাতটি দিন আসামের দোকানপাট বন্ধ। রাস্তায় শোকের নীরবতা। পুরো একটা রাজ্য যেন নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেছে। একজন মানুষ কতটা গভীরে গেলে একটা ভূখণ্ড তার জন্য সাতদিন কাঁদে? এই প্রশ্নের উত্তর পরিসংখ্যানে নেই। ইতিহাসের বইয়ে আছে কিনা জানি না। কিন্তু আসামের মানুষের বুকে আছে — লেখা আছে, মুছবে না।

সেই সুর শুধু অসমিয়া ভাষায় বন্দি থাকেনি। একবার পা রেখেছিলেন বাংলা সিনেমায়ও। ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ — মুভিটার কথা মনে আছে? সেই ছবিতে জুবিনের কণ্ঠ ধার করে ঠোঁট মেলিয়েছিলেন নায়ক রাহুল। কী অদ্ভুত নিয়তি। রাজার গান, রাজার মতো গলা — আর রাহুলের মুখে সেই গান যেন বেমানান ছিল না একটুও। দুইজন মিলে একটা মুহূর্ত তৈরি করেছিলেন, যেটা বাংলাদেশের দর্শক মনে রেখেছে।

কিন্তু জীবন কখনো গল্পের মতো সহজ হয় না।

জুবিন চলে গেলেন অকালে। তারপর মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে — রাহুলও। পানিতে ডুবে। দুটো মৃত্যু, দুটো শোক, একটাই অনুভূতি। আমি মিলাতে পারি না। সত্যিই পারি না। দুজন মানুষ — একজন কণ্ঠ দিলেন, একজন মুখ দিলেন — একটা গানের জন্য একসাথে জড়িয়ে গেলেন, আর একটা সময়ের ব্যবধানে দুজনেই চলে গেলেন। এই কাকতালীয়তা কি নিছক কাকতাল? নাকি ভাগ্য কখনো কখনো এত নির্মম হয় যে তার গল্প লেখার সাহস কোনো কথাসাহিত্যিকেরও হয় না?

ওই মন্তব্যকারী লিখেছেন — কোনো কিছুর বিনিময়ে যদি মৃত মানুষকে ফিরিয়ে আনা যেত, তাহলে বলতাম জুবিন দাকে ফিরিয়ে দিন। একবার দেখা করতে চাই। আসাম যেতে চাই।

এই একটা লাইনে পুরো মানবজাতির ব্যর্থতার গল্প আছে। আমরা মানুষকে চিনি না, জানি না — যতক্ষণ সে থাকে। আর যখন সে নেই, তখন আমাদের ভেতরে হঠাৎ সে বিশাল হয়ে ওঠে। আসামও কি এই ব্যথার বাইরে? তাদের পরম ভালোবাসার জুবিন নেই — এটা তারা মানতে পারছে না। সাতদিন পেরিয়ে গেছে, মাস পেরিয়েছে। কিন্তু আসাম এখনও প্রায় থমকেই আছে। কোনো শূন্যতা এত সহজে পূরণ হয় না।

রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে। কিন্তু সুন্দর যিনি, তিনি চলে গেলেও ভুবনে তাঁর ছাপ থেকে যায়। জুবিন গর্গ সেই ছাপের নাম। শিল্পী মরেন না আসলে। তাঁর দেহ যায়, তাঁর উপস্থিতি যায়। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি রয়ে যায় — লক্ষ মানুষের হৃদয়ে, স্ক্রিনের আলোয়, রাত তিনটের নিঃসঙ্গতায়, ভোরের কুয়াশায়।

বলতে পারি না এর অর্থ কী। বলতে পারি না কেন ভালো মানুষেরা এত তাড়াতাড়ি চলে যায়। হয়তো উত্তর নেই। হয়তো শুধু মনে রাখাটুকুই আমাদের কাজ।

ওপারে ভালো থেকো, আমাদের রাজা জুবিন। ভালো থেকো, প্রাণের নায়ক রাহুল। তোমাদের গান আছে, থাকবে। ব্রহ্মপুত্র যেমন থাকে — শোকে না থেমে, বয়েই চলে।

লেখক: সাংবাদিক, কবি, কথাসাহিত্যিক, কলামিষ্ট, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী। হোয়াটসঅ্যাপ: 01718456839

Please Share This Post in Your Social Media

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর
All rights reserved © 2013- 2026