আই জামান চমক, icrbd24:ঘাঘট নদীর পাড়ে একবার দাঁড়িয়েছিলাম। জলের রং তখন কিছুটা ঘোলা, কিছুটা শান্ত। নদীটি ছোট, কিন্তু রংপুরের মানুষের বুকে এর জায়গা অনেক বড়। দূরে তিস্তার কথা মনে পড়ে। সেই তিস্তা, যে একদিন ছিল উত্তরবঙ্গের জীবনরেখা, আজ শুকিয়ে যাওয়া এক বেদনার নাম। ধুলোয় মাখামাখি, কুয়াশায় ঢাকা এই শহরের রাস্তায় মানুষ হাঁটে নুয়ে-পড়া পিঠ নিয়ে। দুটো নদীর গল্পই আসলে রংপুরের গল্প — অনেক সম্ভাবনা, অনেক অবহেলা, অনেক অপেক্ষা।
রংপুরকে আমি কাছ থেকে দেখেছি। এই শহরের রাস্তায় ময়লার স্তূপ, জলাবদ্ধতায় ডুবে থাকা মহল্লা, ট্রাফিকের অসহ্য জট, ফুটপাত বলে কিছু নেই — এই ছবিগুলো মাথায় গেঁথে আছে। অথচ রংপুর বিভাগীয় শহর। এখানে মানুষ আছে, প্রাণ আছে, সংগ্রাম আছে। শুধু নেই একটি পরিকল্পিত ভবিষ্যৎ। রংপুর অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত। কিন্তু রংপুর হাল ছাড়েনি।
আমি আব্দুল মালেক ভাইকেও কাছ থেকে দেখেছি, কিছুটা চিনেছি। রাজনীতির মঞ্চে যারা বুকে হাত দিয়ে বক্তৃতা দেন, তারা অনেকেই মঞ্চ ছেড়ে নেমে গেলে আর পাওয়া যায় না। মালেক ভাই সেরকম নন — এটুকু আমি বলতে পারি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে। মানুষের সঙ্গে মিশে থাকেন, কথা শোনেন, বুঝতে চান। তিনি চুপচাপ স্বপ্ন দেখেন না — ভাবেন, বলেন, লিখেন। এই গুণটা ক্ষমতার রাজনীতিতে বিরল।
তিনি এবার রংপুর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে প্রার্থী হতে চান। আর সেই ঘোষণার সঙ্গে তিনি যে স্বপ্নের কথা বলেছেন — সেটা পড়তে পড়তে আমি থমকে গেছি। শুধু প্রতিশ্রুতির তালিকা নয়, এটা একটা দর্শন। রংপুরকে তিনি শুধু একটি সিটি কর্পোরেশন হিসেবে দেখতে চান না — দেখতে চান উত্তরাঞ্চলের প্রথম “স্মার্ট আরবান ইকোনমিক জোন” হিসেবে। কথাটা বড় — কিন্তু অসম্ভব নয়।
তিনি বিশ্ব দেখেছেন। নানা দেশের নগরব্যবস্থা তাঁর চোখের সামনে দিয়ে গেছে। যে মানুষ সিঙ্গাপুর বা কুয়ালালামপুরের পরিচ্ছন্ন ফুটপাত দেখেছেন, তিনি রংপুরের ভাঙা পথ দেখে চুপ থাকতে পারেন না। ভাবুন একবার — আন্তর্জাতিক মানের ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট, সোলার স্ট্রিট লাইটিং, ডিজিটাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। এগুলো কি কেবল ঢাকা বা চট্টগ্রামের জন্য? নাকি রংপুরের মানুষেরও অধিকার আছে পরিষ্কার ফুটপাতে হাঁটার, পার্কে বসে সন্ধ্যা কাটানোর, মোবাইলে ক্লিক করে নগরসেবা পাওয়ার? আমি মনে করি — আছে।
রাস্তা বানালেই উন্নয়ন হয় না। মালেক ভাই নিজেই বলছেন — উন্নয়ন মানে মানুষের জীবনধারার পরিবর্তন। তাঁর পরিকল্পনায় একটা বাক্য আমাকে বিশেষভাবে টানছে — “নাগরিক সেবা পেতে ঘুষ নয়, লাগবে শুধু একটি ক্লিক।” এই একটি বাক্যে তিনি রংপুরের বছরের পর বছরের গ্লানিকে ধরেছেন। কতজন মানুষ জন্মনিবন্ধন করাতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেছেন, টেবিলে টাকা না রাখলে কাজ হয়নি — সেই সত্য আমরা সবাই জানি। কথাটা সহজ, কিন্তু বাস্তবায়ন করতে পারলে এটা বিপ্লব।
ঘাঘটের কথায় ফিরি। এই নদীর পাড় ঘেঁষে যে মানুষগুলো বাস করে, তাদের সন্তানেরা বর্ষায় কাদায় হেঁটে স্কুলে যায়। গ্রীষ্মে রাস্তায় ছায়া নেই, শীতে পাবলিক স্পেস বলতে কিছু নেই। মালেক ভাই লিখেছেন শিশু ও প্রবীণবান্ধব পাবলিক স্পেসের কথা, গ্রীন করিডোরের কথা, নগরের তাপমাত্রা কমানোর কথা। আমার মনে হলো, তিনি সেই বাচ্চাটার কথা ভেবেছেন, সেই বৃদ্ধ মানুষটার কথা ভেবেছেন যার হাঁটার জায়গা নেই।
তিস্তার ক্ষত অনেক গভীর। ভাঙন, বন্যা, শুষ্ক মৌসুমে মরুপ্রায় বুক — এই নদীর সংকট আসলে উত্তরবঙ্গের সংকট। রংপুর যদি সত্যিই আধুনিক ফ্লাড কন্ট্রোল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা পায়, তাহলে তিস্তার বর্ষার জল আর শহরকে ডোবাবে না। এটা কল্পনা নয়, প্রকৌশলের প্রশ্ন।
তরুণদের কথাও আছে তাঁর পরিকল্পনায়। আইটি হাব, স্টার্টআপ জোন, উদ্যোক্তাদের জন্য আধুনিক কর্মপরিবেশ। রংপুরের তরুণেরা কম মেধাবী নয়। তাদের এই শহর ছেড়ে ঢাকায় পালিয়ে যেতে হয় কারণ রংপুরে সুযোগ নেই — এই বাস্তবতাটা বদলানোর সময় এসেছে। যে মানুষ ই-চার্জিং স্টেশন আর স্মার্ট স্বাস্থ্যসেবার কথা বলেন, তিনি শুধু বলতেই পারেন না — তাঁকে বুঝতে হয়, দেখতে হয়, মন থাকতে হয়।
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “আমাদের সমাজের যে অংশটা দেখতে পাই না, সেটাকেই সবচেয়ে বেশি ভুলে থাকি।” উত্তরাঞ্চল বহু বছর ধরে সেই অদেখা অংশ। ঢাকার আলোয় যখন দেশ চকচক করেছে, তখন রংপুরের পথে জমেছে কুয়াশা আর অবহেলা। কিন্তু ইতিহাস বলে, যে শহর নিজের ভেতরে একজন সৎ স্বপ্নদ্রষ্টা পায় — সে শহর বদলে যায়।
চার্চিল একবার বলেছিলেন, “একজন রাজনীতিবিদ পরের নির্বাচনের কথা ভাবেন, একজন নেতা পরের প্রজন্মের কথা।” অনেকে বলবেন, এসব স্বপ্নের কথা। বলা সহজ, করা কঠিন। আমিও জানি — রাজনীতির মাঠে প্রতিশ্রুতির বাজার বড় সস্তা। কিন্তু আমি যখন মালেক ভাইকে দেখি — তাঁর চোখে, তাঁর কথায়, তাঁর গণমানুষের সঙ্গে থাকার ধরনে — তখন মনে হয় এই মানুষটা অন্যরকম। বিশ্বাসটা অন্ধ নয়, পর্যবেক্ষণের ফসল।
ঘাঘটের জল হয়তো বেশি কথা বলে না। কিন্তু সে দেখেছে অনেক কিছু। এই শহরের ওঠাপড়া, স্বপ্ন আর হতাশা। মালেক ভাই যদি মেয়র হন এবং তাঁর এই পরিকল্পনার অর্ধেকও বাস্তবে রূপ পায় — তাহলে রংপুরের পরের প্রজন্ম একটা ভিন্ন শহরে বড় হবে। আজ যদি সেই নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে কেউ রংপুরকে নতুন করে দেখার সাহস দেখান, তাহলে নদীও হয়তো একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে।
রংপুর, তুমি কি শুনতে পাচ্ছ? তোমার একজন মানুষ তোমাকে ভালোবাসে। তোমার জন্য স্বপ্ন দেখে। অবহেলার শহর থেকে আধুনিক নগরের পথে হাঁটার সময় এসেছে। আর এই অঙ্গীকার রাখার মানুষ যদি থাকেন — তাহলে স্বপ্ন একদিন বাস্তব হয়।
লেখক: সাংবাদিক, কবি, কথাসাহিত্যিক, কলামিষ্ট, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী। হোয়াটসঅ্যাপ: 01718456839