আই জামান চমক:
জনপ্রিয়তা বা ‘পপুলারিটি’ শব্দটি আজকের যুগে এক সোনার হরিণের মতো, যা অনেকেই জীবন দিয়েও পেতে চায়। কিন্তু জনপ্রিয়তা মানে কি সব সময়ই গুণ, মেধা অথবা ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি? এক বিজ্ঞ ব্যক্তির বক্তব্য, “জনপ্রিয়তা বেশ্যারও থাকে: ল্যাংটা ভিডিওতে ভিউ বেশি হয়”—এটি একবিংশ শতাব্দীর সোশ্যাল মিডিয়া-নির্ভর সমাজের এক কদর্য, কিন্তু কঠিন সত্যকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়।
ওই বক্তব্যের সঙ্গে উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের উদ্ধৃতিটি দারুণভাবে প্রাসঙ্গিক: “জনপ্রিয়তা মানুষের ভিড় এনে দেয়, কিন্তু সম্মান এনে দেয় কেবল সততা।” আজ আমরা যে জনপ্রিয়তা দেখি, তার বেশিরভাগটাই সততা, গভীরতা বা কোনো মহৎ কাজের ফল নয়। বরং, এটা হলো কৌতূহল, ক্ষণস্থায়ী উত্তেজনা এবং শো-অফের প্রতি আমাদের প্রবৃত্তিগত আকর্ষণ।
আজকের দিনে ইউটিউব, ফেসবুক বা টিকটকে সবচেয়ে বেশি ‘ভিউ’ বা ‘ক্লিক’ পাচ্ছে কী? অনেক সময় দেখা যায়, যে কনটেন্টগুলো সমাজের জন্য ক্ষতিকর, কুরুচিপূর্ণ বা সস্তা উত্তেজনার জন্ম দেয়, সেগুলোই ভাইরাল হচ্ছে।
ধরুন, একজন পণ্ডিত ব্যক্তি বছরের পর বছর গবেষণা করে একটি জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধ প্রকাশ করলেন, যেখানে সমাজের গভীর সমস্যাগুলোর সমাধান আছে। হয়তো তাতে ভিউ হলো দুই হাজার। অন্যদিকে, কেউ একজন স্বল্পবসনে বা অশালীন অঙ্গভঙ্গিতে একটি ১৫ সেকেন্ডের রিলস আপলোড করলেন, যেখানে কোনো বার্তা বা মেধা নেই। তাতে ভিউ হলো দুই লক্ষ।
এই বৈপরীত্য প্রমাণ করে, বর্তমান জনপ্রিয়তার মানদণ্ডটি নৈতিক নয়, বরং প্রবৃত্তিগত। মানুষ দ্রুত বিনোদন চায়, মস্তিষ্ক খাটাতে চায় না।
এখানেই আরেকটি গভীর সত্য যোগ হয়। ভিউ কামানোর জন্য বেসুরো গলায় গাওয়া অথবা লাজ শরম ভুলে যা খুশি তাই করাটা কেবল কিছু টাকা উপার্জনের পথ হতে পারে, একে জনপ্রিয়তা বা ব্যক্তিত্ব বলে না।
এই ধরনের কৌশল হলো ক্ষণস্থায়ী, কেবল কিছু ‘ক্লিক-ফিশিং’-এর মাধ্যমে দ্রুত টাকা উপার্জনের পথ। যিনি এই পথে হাঁটেন, তিনি হয়তো সাময়িক মনোযোগ পান, কিন্তু প্রকৃত ব্যক্তিত্ব, পান্ডিত্য বা শিল্পমূল্য অর্জন করেন না। তাঁর এই কাজ সমাজে কোনো দীর্ঘস্থায়ী ইতিবাচক প্রভাব ফেলে না।
যেমন, কেউ একজন হয়তো পাঁচ মিনিট ধরে ভুলভাল তথ্য দিয়ে চেঁচামেচি করে একটি ভিডিও বানালেন। এটি হয়তো ভাইরাল হলো তার ‘নাটকীয়তা’-র জন্য, কিন্তু সেই কনটেন্ট নির্মাতা কোনোভাবেই একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে গণ্য হতে পারেন না। এটি কেবলই সস্তা জনপ্রিয়তার হাতছানি।
সানি লিওনি বা মিয়া খলিফার কথায় হয়তো অনেকেই নাক সিঁটকাবেন, কিন্তু এর মাধ্যমে আমাদের বুঝতে হবে—যেকোনো উত্তেজক বা নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি মানুষের এক ধরনের আদিম আকর্ষণ থাকে। এই আকর্ষণকে পুঁজি করেই তাদের মতো ব্যক্তিরা রাতারাতি মিলিয়ন মিলিয়ন ফলোয়ার পেয়ে যান। তাদের এই জনপ্রিয়তা কি তাদের ভালো মানুষ হিসেবে প্রমাণ করে? নিশ্চয়ই না। বরং এটি প্রমাণ করে, সমাজের একটি বৃহৎ অংশ ‘সস্তা’ বা ‘নিষিদ্ধ’ বিনোদনে মত্ত।
তাই, যখন কেউ শুধুমাত্র লাইক, কমেন্ট ও ফলোয়ারের সংখ্যা দেখে একজন মানুষকে বিচার করে, তখন তারা আসলে ওই ব্যক্তির সত্যিকারের মূল্যবোধ বা পান্ডিত্যকে উপেক্ষা করে। জনপ্রিয়তার ভিড়ে প্রকৃত গুণ বা মেধা অনেক সময় চাপা পড়ে যায়।
আমার মনে হয়, আমাদের প্রত্যেকের এই জনপ্রিয়তার ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসা উচিত।
জনপ্রিয়তা হয়তো একটা ক্ষণস্থায়ী ঝলকানি দিতে পারে, কিন্তু সম্মান ও ভালোবাসা আসে কেবল গভীরতা, সততা আর মানবিক মূল্যবোধ থেকে। সোশ্যাল মিডিয়ার এই গোলকধাঁধায় নিজের বিবেককে যেন আমরা হারিয়ে না ফেলি—এটাই আমার প্রত্যাশা।
-লেখক: কবি, সাংবাদিক, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী