আই জামান চমক: ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটিশ শাসকরা যখন নতুন দিল্লিতে কোবরা সাপের উপদ্রবে অতিষ্ঠ, তখন তারা এক অভিনব কৌশল নিলেন। তারা ঘোষণা করলেন, যে যত মৃত কোবরা এনে জমা দেবে, তাকে সেই অনুপাতে পুরস্কার বা ‘বাউন্টি’ দেওয়া হবে। উদ্দেশ্য ছিল মহৎ—সাপের সংখ্যা কমিয়ে জনজীবন স্বাভাবিক করা। কিন্তু এর ফল হলো সম্পূর্ণ বিপরীত এবং জন্ম দিল এক নতুন ধারণার, যা আজ বিশ্বজুড়ে “কোবরা প্রভাব” (Cobra Effect) নামে পরিচিত।
মানুষ পুরস্কারের লোভে কী করল? তারা কোবরা হত্যা না করে বরং কোবরা পালন করা শুরু করল। খামারে, বাড়িতে, গোপনে বাড়তে থাকল বিষধর সাপের বংশবৃদ্ধি। নির্দিষ্ট সময় পর সাপগুলোকে মেরে তারা পুরস্কার নিতে লাগল। যখন ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ এই জালিয়াতি টের পেল এবং পুরস্কার দেওয়া বন্ধ করল, তখন সাপুড়েরা তাদের পালিত অগণিত কোবরাগুলোকে জঙ্গলে বা লোকালয়ে ছেড়ে দিল। ফলাফল—কোবরা সাপের সংখ্যা আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে গেল। সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতে গিয়ে সমস্যা আরও জটিল ও ভয়ানক হয়ে উঠল।
এই ঘটনা আমাদের শেখায় যে, যখন কোনো সমস্যার সমাধান করার জন্য একটি পদক্ষেপ নেওয়া হয়, কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে সেই পদক্ষেপের ফল উল্টো হয় এবং মূল সমস্যাটিকে আরও বাড়িয়ে তোলে, তখন তাকেই কোবরা প্রভাব বলা যায়। আমাদের সমাজেও এই সমস্যাটা কমবেশি একই!
ধরুন, সরকার পরিবেশ রক্ষায় প্লাস্টিক দূষণ কমাতে মোটা অঙ্কের জরিমানা চালু করল। দেখা গেল, কিছু অসাধু লোক জরিমানা এড়াতে রাতের আঁধারে বা লোকচক্ষুর আড়ালে আরও বেশি পরিমাণে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলে দিচ্ছে অথবা অন্য কোনো ক্ষতিকর উপায়ে তা সরিয়ে ফেলছে। উদ্দেশ্য ভালো থাকলেও, ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগে সমস্যা আরও বড় হলো। ঠিক তেমনই, যখন কোনো প্রকল্পের মাধ্যমে বেকারত্ব কমাতে গিয়ে ঋণ দেওয়া হয়, কিন্তু সেই ঋণ অনুৎপাদনশীল খাতে খরচ হয়ে যায় বা আত্মসাৎ হয়, তখন কর্মসংস্থান না বেড়ে উল্টো ঋণের বোঝা বাড়ে।
আসলে, কোনো নীতি বা ব্যবস্থা প্রণয়নের সময় এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও মানুষের স্বার্থান্বেষী আচরণের দিকটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা উচিত। কেবল মহৎ উদ্দেশ্য যথেষ্ট নয়, তার বাস্তবায়ন পদ্ধতি ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবও বিচার্য। তা না হলে সেই কোবরা-পালকের মতোই পরিস্থিতি তৈরি হবে, যেখানে আমরা সাময়িক স্বস্তি পেতে গিয়ে ভবিষ্যতের জন্য এক বিরাট বিষধর সংকটকে আমন্ত্রণ জানাব। সমস্যার মূলে হাত না দিয়ে কেবল উপরিভাগে সমাধান খুঁজতে গেলে এই কোবরা প্রভাব বারবার ফিরে আসতে পারে। আমি বলতে চাই, আমাদের নীতি-নির্ধারকদের উচিত প্রতিটি সমাধানের ‘উল্টো ফল’ বা ‘লুকানো বিপদ’ সম্পর্কে সচেতন থাকা।
-লেখক: কবি, সাংবাদিক, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী