আই জামান চমক: মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর (Maulana Abdul Hamid Khan Bhashani) নামটি কেবল একটি ঐতিহাসিক চরিত্র নয়, বরং একটি আদর্শের প্রতিচ্ছবি। বিশ্বনন্দিত এই মজলুম জননেতার জীবন এবং কর্ম— উভয়ই ছিল এক বিশাল ক্যানভাস। সেখানে একদিকে ছিল গণমানুষের জন্য অবিচল সংগ্রাম, অন্যদিকে এক নির্মোহ সাধকের জীবন দর্শন। আপনি যে কথাটি বলেছেন, তা তাঁর চরিত্রের গভীরতম দিকটিকেই উন্মোচন করে। সেই যুগের শ্রেষ্ঠ আলেম-ওলামাদের মন্তব্য— “মাওলানা ভাসানী-যুগের শ্রেষ্ঠ আউলিয়া, রাজনীতির খোলস পড়ে চলে গেল। কেউ তারে চিনল। কেউ তারে চিনল না”— এই বাক্যটি তাঁর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা আধ্যাত্মিক সত্তাটিকে দারুণভাবে ফুটিয়ে তোলে। আমার মনে হয়, তাঁর এই দুই সত্তার সার্থক মেলবন্ধনই তাঁকে কিংবদন্তী করেছে।
মাওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক জীবন ছিল আগুনের মতো তেজস্বী। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে পাকিস্তানের স্বৈরশাসন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম দিকের রাজনীতি— সবখানেই তাঁর উপস্থিতি ছিল প্রদীপ্ত। তিনি কখনো ক্ষমতার লোভে রাজনীতি করেননি; বরং রাজনীতিকে দেখেছিলেন দরিদ্র ও শোষিত মানুষের মুক্তিলাভের একটি হাতিয়ার হিসেবে। তাঁর ‘খামোশ’ শব্দটি, তাঁর ‘লাঙল যার জমি তার’ স্লোগান, কিংবা আসামের বাঙালিদের জন্য তাঁর ঐতিহাসিক সংগ্রাম— প্রতিটি পদক্ষেপই ছিল মজলুমের পক্ষে এক বজ্রকণ্ঠের গর্জন। টাঙ্গাইলের সন্তোষে তিনি যে সাধারণ জীবন যাপন করতেন, তা থেকে বোঝা যায়, ক্ষমতার মসনদের প্রতি তাঁর বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। একজন রাজনৈতিক সন্ন্যাসী-এর মতোই তিনি তাঁর জীবন অতিবাহিত করেছেন।
কিন্তু তাঁর এই রাজনৈতিক খোলসের ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক সাধক বা আউলিয়ার মনন। একজন আউলিয়া যেমন জাগতিক মোহ ত্যাগ করে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে হাঁটেন, তেমনি মাওলানা ভাসানীও ক্ষমতার আরাম-আয়েশ, অর্থের হাতছানি সবকিছু ত্যাগ করে সাধারণ মানুষের কাতারে শামিল হয়েছিলেন। তাঁর জীবনযাত্রা ছিল অত্যন্ত সরল। পির বা দরবেশদের মতো তিনি আল্লাহর উপর নির্ভরশীলতা ও অল্পে তুষ্টির (খানিকটা ‘ফকিরি’ জীবন) শিক্ষা দিতেন। এই আধ্যাত্মিক বোধই তাঁকে রাজনৈতিক ভণ্ডামি ও সুবিধাবাদ থেকে দূরে রেখেছিল। সাধারণ রাজনীতিবিদরা যখন নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতে ব্যস্ত থাকেন, তখন তিনি হেঁটেছেন জনকল্যাণের পথে, অনেকটা নিঃস্বার্থভাবে, যেমনটা একজন সাধক করে থাকেন।
আমার বলতে ইচ্ছে করে, এই কারণেই অনেক বড় ব্যক্তিত্ব ও আলেম-ওলামা তাঁকে যুগের শ্রেষ্ঠ আউলিয়া হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। কারণ, তিনি লোকচক্ষুর সামনে ছিলেন রাজনীতিবিদ, কিন্তু অন্তরের দিক থেকে ছিলেন মানবসেবায় নিবেদিত এক আধ্যাত্মিক পুরুষ। ‘কেউ তারে চিনল, কেউ তারে চিনল না’— এই কথাটি এক গভীর সত্যের ইঙ্গিত বহন করে। যারা তাঁর রাজনৈতিক কৌশল, তীব্র প্রতিবাদ আর গণ-সংগঠনের দিকটি দেখেছেন, তারা তাঁকে চিনলেন একজন জননেতা হিসেবে। আর যারা তাঁর ত্যাগের মহিমা, সরল জীবনযাপন, এবং মজলুমের প্রতি তাঁর গভীর দরদ উপলব্ধি করলেন, তারা তাঁকে চিনলেন রাজনীতির আবরণ ভেদ করে আসা এক আধ্যাত্মিক গুরু বা আউলিয়া হিসেবে।
আমরা যদি আমাদের চারপাশের সমাজে দৃষ্টি দিই, দেখব— অনেকেই বড় পদে থেকেও জনগণের সেবা করে না, আবার অনেকে সাধারণ জীবন যাপন করেও হাজারো মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেয়। মাওলানা ভাসানীর জীবন আমাদের সেই শিক্ষাই দেয় যে নেতৃত্বের আসল পরীক্ষা হয় ত্যাগে, ভোগে নয়। তিনি ছিলেন এমন এক প্রদীপ, যা রাজনীতি ও আধ্যাত্মিকতা— দুই ক্ষেত্রেই আলো ফেলেছে। তাঁর এই দ্বৈতসত্তা তাঁকে করে তুলেছে বাঙালির ইতিহাসে এক চিরন্তন, রহস্যময় ও অনন্য সাধারণ ব্যক্তিত্ব।
-লেখক: কবি, সাংবাদিক, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী