সাংবাদিকতা পেশাটি কখনোই সহজ ছিল না। সমাজের অসঙ্গতি, অনিয়ম আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে কলম ধরা মানেই কন্টকশয্যা গ্রহণ করা। এই ঝুঁকি আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায় যখন আপনি পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জের মতো ছোট কোনো মফস্বল শহরে কাজ করেন, যেখানে খয়ের বাগান আর ময়নামতীর চরের শান্ত রূপের আড়ালে কখনো কখনো ভূমিদস্যুদের হিংস্রতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। দেবীগঞ্জের করতোয়া নদী তার নিরবধি স্রোতধারায় কত শত ঘটনা, কত সহস্র সুখ-দুঃখের সাক্ষী। কিন্তু সম্প্রতি এই শান্ত জনপদে এক নতুন অশান্তির ঢেউ আছড়ে পড়েছে, যার মূল কারণ একজন সাহসী তরুণ সাংবাদিকের ওপর ভূমি জালিয়াতকারী চক্রের আক্রমণ ও হয়রানি। সংবাদ সংগ্রহের মতো পবিত্র পেশায় যুক্ত থাকা এক তরুণ, নাম তার লালন সরকার, আজ এক ভূমিদস্যু ও জালিয়াতকারী মিলনের ক্রমাগত মিথ্যাচার এবং হুমকির শিকার। এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং গোটা সমাজের জন্য এক অশনিসংকেত।
পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে লালন সরকারসহ চারজন সাংবাদিক মিলনের নির্দেশে আক্রমণের শিকার হন। এর পর থেকেই মিলন প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে বেড়াচ্ছে যে, সে লালনের ‘সাংবাদিকতার খায়েশ মিটিয়ে দেবে।’ কী ভয়ঙ্কর ঔদ্ধত্য! সংবাদ সংগ্রহ করে সত্য তুলে ধরা কি তবে খায়েশ মিটানোর মতো কোনো তুচ্ছ কাজ? যখন একজন ভূমি জালিয়াতকারী, যার বিরুদ্ধে অন্যের জমি জালিয়াতি করে বিক্রি করার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, সে একজন সাংবাদিককে এমন প্রকাশ্য হুমকি দেয়, তখন বুঝতে হবে আমাদের সমাজে সত্যের কণ্ঠস্বর কতটা অরক্ষিত।
লালন সরকার অবশ্য থেমে থাকেননি। তিনি এই হুমকির বিরুদ্ধে দেবীগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। কিন্তু তাতে শঙ্কা কাটেনি, বরং মিলন আরও বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠেছে। তার ফেসবুক পোস্টগুলো থেকে তার হিংস্র মনোভাব স্পষ্ট। এই ধরনের অপপ্রচার ও হুমকি ইঙ্গিত দেয় যে, যেকোনো মুহূর্তে লালন বা অন্য কোনো সাংবাদিকের ওপর বড় ধরনের হামলা হতে পারে।
সাংবাদিকতা হলো সমাজের দর্পণ। এই দর্পণে যখন ধুলো জমানোর চেষ্টা হয়, যখন এই দর্পণ ভেঙে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়, তখন বুঝতে হবে সমাজ এক গভীর সংকটের মধ্যে রয়েছে। দেবীগঞ্জের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংবাদিকতার অঙ্গনে যে বিভাজন ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল রয়েছে, তা এই ধরনের অশুভ শক্তিকে আরও আস্কারা দেয়। এখানকার ‘কাকের মাংস কাকেই খায়’—এই প্রবাদটি যেন আরও বেশি বাস্তব হয়ে ওঠে।
গণমাধ্যম কর্মীদের হয়রানি ও হুমকি স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর সরাসরি আক্রমণ। একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশের জন্য সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রশাসনের উচিত, এই ধরনের হুমকিদাতাদের বিরুদ্ধে দ্রুত এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। দেবীগঞ্জের করোতোয়া নদীর মতো লালনও সম্ভবত জানেন, তার পথটি মোটেও মসৃণ নয়, বরং কন্টকময়। কিন্তু তার ভয় নেই। তিনি তার কাজ সম্পর্কে সচেতন। তার মতো তরুণদের সাহসিকতাই সমাজের বুকে আলোকবর্তিকা জ্বালিয়ে রাখে। তাদের এই লড়াই কেবল ব্যক্তিগত নয়, এটি সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে সমগ্র সমাজের লড়াই। তাদের এই লড়াইয়ে পাশে থাকা আমাদের সবার কর্তব্য।
-লেখক: কবি, সাংবাদিক ও আবৃত্তি শিল্পী