এক স্বপ্নভঙ্গের করুণ ইতিহাস: বৈষম্যের বিরুদ্ধে চিরন্তন লড়াই
আই জামান চমক
বৃহস্পতিবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৫
Share
১৯৪৭ সাল। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর ভারতীয় উপমহাদেশ বিভক্ত হলো, জন্ম নিল দুটি নতুন রাষ্ট্র—ভারত ও পাকিস্তান। দীর্ঘ ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ফল হিসেবে এই দেশভাগ ছিল এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কিন্তু যে স্বপ্ন নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছিল, সেই স্বপ্ন বাংলাদেশের মানুষের কাছে দ্রুতই এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে যে, বৈষম্যই সকল সংগ্রামের মূল কারণ। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে যে বৈষম্যের প্রতিবাদে লাখো মানুষ জীবন দিয়েছিল, সেই একই বৈষম্যের শিকার হলো বাঙালি জাতি নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানে।
স্বপ্নভঙ্গ ও নতুন সংগ্রামের সূচনা
পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই বাঙালি জাতি নানা বৈষম্যের শিকার হতে থাকে। ভাষা থেকে শুরু করে অর্থনীতি, রাজনীতি, চাকরি—সবকিছুতেই পূর্ব পাকিস্তানকে বঞ্চিত করা হচ্ছিল। পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে দমিয়ে রাখতে চেয়েছিল, আমাদের অর্থনৈতিক সম্পদ লুট করে নিজেদের সমৃদ্ধি বাড়াচ্ছিল। যে স্বাধীনতার জন্য আমরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়েছি, সেই স্বাধীনতা আমাদের নতুন প্রভুদের হাতে বন্দি হলো। এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রথম রুখে দাঁড়ায় আমাদের ভাষা শহীদরা। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, প্রতিটি আন্দোলনই ছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে বাঙালির দৃপ্ত প্রতিবাদের প্রতিচ্ছবি।
এরপর ১৯৭১ সালে শুরু হলো সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে, অসংখ্য মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা পেলাম আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। আমরা ভেবেছিলাম, এবার বুঝি বৈষম্য ও শোষণ থেকে মুক্তি মিলল। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকেই শুরু হলো নতুন এক অধ্যায়, যেখানে ক্ষমতা লিপ্সু রাজনীতিবিদরা জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করল।
লুটপাটের রাজত্ব ও বৈষম্যের নতুন রূপ
স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন ব্যক্তিরা জাতিকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা যেন তারা ভুলে গেলেন। বৈষম্যের অবসান ঘটানোর পরিবর্তে তারা নিজেরাই এক নতুন ধরনের বৈষম্য ও লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করলেন। দেশপ্রেমের চেয়ে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থ বড় হয়ে উঠল। স্বাধীনতার মূল চেতনা—সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার—ধীরে ধীরে ম্লান হতে লাগল। দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের এক নতুন সংস্কৃতি গড়ে উঠল, যা আজও আমাদের সমাজকে কলুষিত করে চলেছে।
আমরা দেখেছি কীভাবে রাষ্ট্রযন্ত্র জনগণের সেবক না হয়ে এক শোষণ ও লুটপাটের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। গণতন্ত্রের নামে স্বৈরাচারী শাসন, আর জনগণের কল্যাণের নামে চলছে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর ফায়দা লোটা। এ এক করুণ বাস্তবতা। কিন্তু যখন এই বৈষম্য আর লুটপাটের চূড়ান্ত রূপ দেখা গেল, তখন ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলন এক অনিবার্য বিস্ফোরণ ঘটায়। ২০২৪ সালে শহীদদের জীবনের বিনিময়ে ফ্যাসিস্ট এর পতন হয়েছে, যা আবারও প্রমাণ করে যে, এদেশের জনগণ অন্যায় ও স্বৈরাচারকে কখনো মেনে নেয় না।
ভবিষ্যতের পথ ও আশার বার্তা
মুক্তি পেতে হলে আমাদের আবারও সেই চেতনাকে জাগিয়ে তুলতে হবে, যে চেতনা ১৯৪৭-এর আগে এবং ১৯৭১-এর সময়ে আমাদের জাতিকে এক করেছিল। আমাদের মনে রাখতে হবে, আমাদের পূর্বপুরুষরা ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়েছেন, কারণ তারা চেয়েছিলেন একটি সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ। আজকের এই দিনে সেই সব শহীদদের প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। তাদের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না।
এই প্রবন্ধের মাধ্যমে এক কঠোর হুঁশিয়ারি: জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন প্রমাণ করে যে, ভবিষ্যতে আর কোনো স্বৈরাচার বা বৈষম্য সৃষ্টিকারী শাসকগোষ্ঠীকে আমরা মেনে নেব না। যারা ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে জনগণের অধিকার কেড়ে নিতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে আবারও রুখে দাঁড়াতে হবে। আজ আমাদের তরুণ প্রজন্মকে বুঝতে হবে, দেশের সত্যিকারের মুক্তি আসে শুধু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নয়, বরং বৈষম্যহীন একটি সমাজ ও দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে। আমাদের আশা রাখতে হবে যে, একদিন এই দেশের মানুষ আবারও ঐক্যবদ্ধ হবে এবং সব ধরনের বৈষম্য ও দুর্নীতিকে দূর করে একটি সত্যিকারের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করবে।