বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাদের অবদানকে খণ্ডিত করা হলে রাষ্ট্রের মূল ভিত্তিই দুর্বল হয়ে যায়। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তেমনই একটি নাম। তাঁর নাম কেবল একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে নয়, বরং মুক্ত গণতন্ত্রের একজন প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেও বাংলাদেশের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে আছে। একাত্তরের রণাঙ্গনে তাঁর স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল একটি জাতির সংকটময় মুহূর্তে আলোর দিশা। পরবর্তীতে এক বিপর্যস্ত দেশকে তিনি পথ দেখিয়েছিলেন স্বনির্ভরতার। তাঁর শাসনামলে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়েছিল, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরে এসেছিল এবং অর্থনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছিল।
আজ দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, যারা জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারগুলোকে উপেক্ষা করে, তারা ভুলে যায় যে তিনিই সেই ব্যক্তি যিনি দেশের মাটিকে সোনা ফলাতে শিখিয়েছিলেন, খাল কেটে সেচের ব্যবস্থা করেছিলেন, এবং ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র অপবাদ ঘুচিয়ে একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, ছিলেন একজন দূরদর্শী স্বপ্নদ্রষ্টা। তাঁর সততা এবং দেশপ্রেমের উদাহরণ আজও মানুষকে অনুপ্রাণিত করে।
তাঁর সততা ছিল কিংবদন্তীতুল্য। অনেকে হয়তো জানেন না, প্রেসিডেন্ট থাকাকালে এক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা তাঁর গ্রামের বাড়িতে একটি বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপন করে দেন। খবরটি জানার পর জিয়াউর রহমান অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। তিনি সাথে সাথেই সেই সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশ দেন এবং তার পরিবর্তে নিজস্ব অর্থায়নে বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যবস্থা করেন। এই ঘটনাটি তাঁর ব্যক্তিগত সততা এবং নীতির প্রতি অবিচল শ্রদ্ধার এক অনন্য উদাহরণ। অন্য একটি উদাহরণ হলো, একজন বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান তাঁকে একটি মূল্যবান ঘড়ি উপহার দিয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান তা গ্রহণ করেননি এবং ঘড়িটি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেন, যা রাষ্ট্রনায়কদের জন্য একটি বিরল দৃষ্টান্ত।
তবে, সবচেয়ে বেশি কষ্ট লাগে যখন দেখি, যে আদর্শের উপর ভর করে তিনি একটি দল গড়ে তুলেছিলেন, সেই আদর্শেরই অবমূল্যায়ন হচ্ছে আজ দলের বিভিন্ন স্তরে। মুক্ত গণতন্ত্র, দেশপ্রেম, সততা এবং দেশের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার যে বার্তা তিনি দিয়ে গিয়েছিলেন, তা আজ অনেক নেতাকর্মীর কর্মকাণ্ডে অনুপস্থিত। ব্যক্তিগত লোভ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নৈতিকতার স্খলন সেই মহান নেতার আদর্শকে ম্লান করে দিচ্ছে।
একটি জাতির জন্য এর চেয়ে বড় দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে? যখন একজন মহান নেতার আদর্শকে তার নিজের অনুসারীরাই ভুলতে বসে, তখন সেই আদর্শের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যায়। আজ সময় এসেছে জিয়াউর রহমানের অবদানের সঠিক মূল্যায়ন করার এবং তার আদর্শের প্রতি পুনরায় নিজেকে সমর্পিত করার। কারণ, জিয়ার আদর্শকে ছোট করা মানে বাংলাদেশকেই ছোট করা।