আইসিআরবিডি টোয়েন্টিফোর icrbd24: রংপুর মহানগর চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত চত্বর থেকে পুলিশের এক কর্মকর্তার মোটরসাইকেল চুরির ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে একটি আন্তজেলা মোটরসাইকেল চোরচক্রের চাঞ্চল্যকর সন্ধান পেয়েছে কোতয়ালী থানা-পুলিশ। এই ঘটনায় পুলিশ অভিযান চালিয়ে সংঘবদ্ধ ওই চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে এবং তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রংপুরের বিভিন্ন এলাকা ও একটি রিকন্ডিশন মোটরসাইকেলের দোকান থেকে মোট নয়টি চোরাই মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কার্যালয় ও আদালতের মতো সুরক্ষিত স্থান থেকে পুলিশের বাইক চুরির ঘটনা এবং একটিমাত্র রিকন্ডিশন দোকান থেকে একসঙ্গে ছয়টি চোরাই বাইক উদ্ধারের ঘটনাটি পুরো এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থে পরিবারগুলোর সচল থাকা এবং দেশের অভ্যন্তরে সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত উপার্জনে কেনা বাহনগুলো এভাবে অরক্ষিত হয়ে পড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিকরা। কারিগরি বিশ্লেষণে দেখা যায়, অপরাধী চক্রগুলো আধুনিক প্রযুক্তির নজরদারি এড়াতে বা চোরাই মালের নম্বর প্লেট ও চেসিস পরিবর্তন করে বিভিন্ন হাতবদলের মাধ্যমে অবৈধ বাজার তৈরি করছে, যা প্রতিরোধে পুলিশি মনিটরিং আরও জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর রংপুর আদালতের ১০ তলা ভবনের নিচে সিঁড়ির পাশে মোটরসাইকেল রেখে কোর্ট হাজতখানার আসামি-সংক্রান্ত কাজে কোর্ট ইন্সপেক্টরের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন কোতয়ালী থানার এসআই রিয়াজুল ইসলাম। কিছুক্ষণ পর কাজ শেষে নির্দিষ্ট স্থানে ফিরে এসে তিনি দেখতে পান যে তাঁর ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি সেখানে নেই। এই অপ্রত্যাশিত চুরির ঘটনায় দ্রুত মামলা দায়ের করা হলে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে আদালত চত্বরের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে তা নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ শুরু করে। সংগৃহীত ফুটেজে কয়েকজন দুর্বৃত্তকে অত্যন্ত সুকৌশলে মোটরসাইকেলটি নিয়ে যেতে পরিষ্কার দেখা যায়। সেই ফুটেজের সূত্র ধরে এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে পুলিশ প্রথমে মোস্তাফিজুর রহমান নামের এক ব্যক্তিকে শনাক্ত করে আটক করতে সক্ষম হয়। প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করে যারা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন, তাদের পরিবারের সদস্যরাও অনেক সময় দেশের ভেতরে এমন সংঘবদ্ধ চোরচক্রের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হন, যা রোধে স্থানীয় প্রশাসনকে আরও কঠোর ও আপসহীন ভূমিকা পালন করতে হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
আটক মোস্তাফিজুর রহমানকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর তাঁর দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ চক্রের বাকী সদস্যদের ধরতে মাঠে নামে। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, এই মামলায় গ্রেপ্তার অন্যান্য ব্যক্তিরা হলেন পীরগঞ্জের শাহাপাড়া-হাজীপুর এলাকার হুমায়ুন কবীর ওরফে রাব্বী, বদরগঞ্জের কুতুবপুর বালুয়াপাড়ার ওবায়দুল হক এবং জামুবাড়ী-যাদুনগর এলাকার রমজান আলী। এছাড়া এই ঘটনার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত রাহাত মিয়া নামের আরও একজন সদস্য বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। আসামিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মিঠাপুকুর, পীরগঞ্জ, রংপুর মহানগর এবং বদরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করা হয়। বিশেষ করে বদরগঞ্জের সিও রোড ব্রিজসংলগ্ন মেসার্স মুগ্ধ রিকন্ডিশন বাইক সেন্টারে অভিযান চালিয়ে সেখান থেকে একসঙ্গে ছয়টি চোরাই মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়। একটিমাত্র রিকন্ডিশন দোকান থেকে বিপুল পরিমাণ চোরাই বাইক উদ্ধারের ঘটনাটি প্রমাণ করে যে এর পেছনে একটি সংঘবদ্ধ ও শক্তিশালী চোরাই মোটরসাইকেল কেনাবেচার নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে এই চক্রটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এক এলাকা থেকে মোটরসাইকেল চুরি করে দ্রুত অন্য জেলায় বা এলাকায় সরিয়ে ফেলত। পরবর্তীতে বিভিন্ন হাতবদল ও ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে এই চোরাই যানবাহনগুলো সাধারণ ক্রেতাদের কাছে বিক্রি বা বাজারে ছাড়ার চেষ্টা করা হতো। উদ্ধার হওয়া নয়টি মোটরসাইকেল কোন কোন স্থান থেকে চুরি করা হয়েছে এবং এই চক্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরক্ষভাবে অন্য কোনো প্রভাবশালী মহল বা চক্রের সদস্যরা জড়িত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশ ব্যাপক তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। প্রবাসীদের কষ্টার্জিত রেমিট্যান্সের টাকায় কেনা বা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচলের বাহন চুরির এই বেপরোয়া সিন্ডিকেট ভাঙতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন অভিযানকে সাধারণ মানুষ অত্যন্ত সাধুবাদ জানিয়েছেন এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলেছেন।
কোতয়ালী থানার তদন্ত কর্মকর্তা মিলন কুমার চ্যাটার্জি গণমাধ্যমকে জানান যে গ্রেপ্তারকৃত চার আসামিকে ইতোমধ্যে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। চক্রের পলাতক সদস্য রাহাত মিয়াসহ অন্যান্য সহযোগীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে এবং উদ্ধারকৃত চোরাই মোটরসাইকেলগুলো ঠিক কোথায় কোথায় সরবরাহ করা হতো তার উৎস উদঘাটন করতে আসামিদের রিমান্ডে নেওয়ার জন্য আদালতে আবেদন করা হবে। সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিধান এবং চোরচক্রের শেকড় উপড়ে ফেলতে এই ধরনের সাঁড়াশি অভিযান আগামীতেও অব্যাহত থাকবে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে দৃঢ়ভাবে জানানো হয়েছে। বাজারের রিকন্ডিশন বাইক বিক্রেতাদেরও আরও বেশি সতর্ক থাকার এবং বৈধ কাগজপত্র যাচাই করে বাইক কেনাবেচা করার কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।
এডিটর: আই জামান চমক। হোয়াটসএ্যাপ: 01718456839