আইসিআরবিডি টোয়েন্টিফোর icrbd24: মাদক একটি মানুষকে ধ্বংস করে, একটি পরিবারকে ভেঙে দেয়, আর ধীরে ধীরে ক্ষত তৈরি করে পুরো সমাজের শরীরে। সেই মাদকের বিরুদ্ধে যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালায়, তখন স্বাভাবিক প্রত্যাশা থাকে সমাজের প্রতিটি বিবেকবান মানুষ পাশে দাঁড়াবেন। কিন্তু নীলফামারীতে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক একটি ঘটনা সেই জায়গাতেই তৈরি করেছে গভীর প্রশ্ন।

ডিমলার মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকা মো. সুজন ইসলামের মুক্তির দাবিতে নীলফামারী পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান ও বিক্ষোভের ঘটনায় ৩৪ জনকে আটক করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ মাদকবিরোধী অভিযানে আটক ব্যক্তির মুক্তির দাবিতে পুলিশের কার্যালয়ের সামনে হট্টগোল ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছিল।
ঘটনাটি নিছক একটি বিক্ষোভের ঘটনা হিসেবে দেখলে হয়তো এর গভীরতা উপলব্ধি করা যাবে না। কারণ এর পেছনে রয়েছে আরও বড় একটি সামাজিক প্রশ্ন। মাদকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র যখন কঠোর অবস্থানে, তখন সেই অভিযানের বিরুদ্ধে কারা, কেন এবং কী উদ্দেশ্যে মাঠে নামছে? পুলিশের নথিতে সুজন ইসলামের বিরুদ্ধে ডিমলা, জলঢাকা, নীলফামারী সদর ও ঢাকার দারুস সালাম থানায় মাদকসংক্রান্ত একাধিক মামলার তথ্য থাকার কথা উঠে এসেছে। এর মধ্যে ২০১৯ সালের ডিমলা ও জলঢাকা, ২০১৮ সালের নীলফামারী সদর এবং ২০২১ সালের দারুস সালাম থানার মামলার তথ্য উল্লেখ রয়েছে। একটি মামলায় তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দেওয়ার তথ্যও রয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে এখানেও একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। মামলা থাকা মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। অভিযোগের সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে। কেউ যদি অন্যায়ভাবে মামলায় জড়িত হয়ে থাকেন, তাঁর ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু সেই ন্যায়বিচারের দাবি কখনোই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার বা পুলিশের কার্যালয়ের সামনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কারণ হতে পারে না।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, আন্দোলনে অংশ নেওয়া প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা, পরিচয় ও উদ্দেশ্যও নিরপেক্ষভাবে যাচাই হওয়া প্রয়োজন। পুলিশ যদি কারও বিরুদ্ধে ভাড়াটে আন্দোলনকারী বা মাদক কারবারির পক্ষে অবস্থানের অভিযোগ করে থাকে, তাহলে সেটিরও প্রমাণভিত্তিক তদন্ত হওয়া দরকার। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী বানানো যেমন ঠিক নয়, তেমনি মাদকবিরোধী অভিযানের আড়ালে কোনো অপরাধীকে রক্ষা করার সুযোগ দেওয়াও ভয়াবহ। একটি শিশুর হাতে যখন মাদকের নেশা পৌঁছে যায়, তখন তার সঙ্গে শুধু একটি পরিবারের স্বপ্নই পুড়ে যায় না, পুড়ে যায় সমাজের ভবিষ্যৎ। একজন মাদকাসক্ত তরুণের পেছনে থাকতে পারে অসহায় মা-বাবা, ভেঙে যাওয়া সংসার, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং অপরাধের দিকে ধাবিত একটি প্রজন্ম। তাই আজ প্রয়োজন পক্ষ নেওয়ার। তবে কোনো ব্যক্তির পক্ষে নয়, মাদকের বিরুদ্ধে পক্ষ নিতে হবে।
পুলিশের অভিযান যদি সঠিক হয়, সমাজকে তার পাশে দাঁড়াতে হবে। অভিযানে কোনো অনিয়ম থাকলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ও প্রমাণভিত্তিক প্রতিবাদ করতে হবে। কিন্তু মাদকবিরোধী অভিযান থামাতে পুলিশের কার্যালয়ের সামনে হট্টগোল, বিশৃঙ্খলা কিংবা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। নীলফামারীর এই ঘটনা তাই শুধু ৩৪ জন আটকের খবর নয়। এটি সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তা।
মাদকের বিরুদ্ধে আজ নীরব থাকা মানে আগামী দিনের কোনো সন্তানের কান্নার দায় নিজের কাঁধে নেওয়া। আসুন, ব্যক্তি নয়, মাদকের বিরুদ্ধে দাঁড়াই। গুজব নয়, সত্যের পক্ষে দাঁড়াই। অন্ধ সমর্থন নয়, ন্যায় বিচারের পক্ষে দাঁড়াই। আর যারা মাদকের সঙ্গে জড়িত, তাদের পরিচয় বা প্রভাব যাই হোক, আইনের আওতায় আনার দাবিতে সবাই ঐক্যবদ্ধ হই। কারণ মাদকবিরোধী লড়াই কোনো ব্যক্তি বা পুলিশের একার লড়াই নয়। এটি একটি প্রজন্মকে বাঁচানোর লড়াই।
এডিটর: আই জামান চমক। হোয়াটসএ্যাপ: 01718456839