আই জামান চমক, icrbd24: করতোয়ার পাড় ধরে হাঁটলে একটা কথা বারবার মনে পড়ে, এই নদী কখনো একলা বয় না। সাথে নিয়ে চলে মাটির গন্ধ, মানুষের গল্প, আর জীবনের অসংখ্য ভাঙাগড়ার ইতিহাস। দেবীগঞ্জের এই মাটিতে এমন অনেক মানুষ জন্ম নিয়েছেন, যাদের জীবন নদীর মতোই। শান্ত, কিন্তু গভীর। নীরব, কিন্তু ফলবান। জাহিদুজ্জামান রাছেলের কথা লিখতে বসে বারবার এই নদীর কথাই মনে পড়ছিল।
২০০৪ সাল। বয়সে তখন তরুণ, মনে তখন স্বপ্ন। দেবীগঞ্জ কলেজের আঙিনায় ছাত্রদলের রাজনীতি দিয়ে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, তা কোনো হঠাৎ সিদ্ধান্ত ছিল না। বরং ছিল একটা তাগিদ, মানুষের পাশে থাকার তাগিদ। রাজনীতি অনেকের কাছে ক্ষমতার সিঁড়ি। কিন্তু কারো কারো কাছে তা দায়িত্বের নাম। রাছেলকে যারা কাছ থেকে চেনেন, তারা জানেন তিনি দ্বিতীয় দলে।
জীবনের চাকা তো শুধু রাজনীতির চাকায় ঘোরে না। ২০১৬ সালে বিলুপ্ত ছিটমহলের নব বাংলা হাই স্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলেন তিনি। একদিকে ক্লাসরুমে শিশুদের হাতে খড়ি, অন্যদিকে ঠিকাদারি ব্যবসার পরিশ্রম। দুটো ভিন্ন জগত, অথচ দুটোই তিনি সামলেছেন একসাথে। এই ভারসাম্য সহজ কথা নয়। যিনি সংসার চালান, যিনি সমাজ গড়েন, তার কাঁধে ভার থাকে দুই দিক থেকেই। তারপর ২০২৩ সালে নিজের ইচ্ছাতেই স্কুলের চাকরি থেকে সরে দাঁড়ালেন। এই সিদ্ধান্তে অনেকে অবাক হয়েছিলেন, কিন্তু যারা তাকে চেনেন তারা জানেন, রাছেল কখনো নিরাপদ পথ বেছে নেননি। তিনি সবসময় বেছে নিয়েছেন সেই পথ, যেখানে মানুষের জন্য কাজ করার সুযোগ বেশি।
২০১৫ সালে দেবীগঞ্জ সদর ইউনিয়ন যুবদলের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। সম্প্রতি দেবীগঞ্জ পৌর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব সামলেছেন ২০২৬ সাল পর্যন্ত। এখন তিনি ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির একজন সদস্য। পদ বদলেছে, দায়িত্ব বদলেছে, কিন্তু একটা জায়গায় তিনি অবিচল থেকেছেন, মানুষের কাছে থাকা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার লিখেছিলেন, মানুষ বড়ো কথায় বড়ো হয় না, বড়ো হয় বড়ো কাজে। রাছেলের রাজনীতি সেই বড়ো কাজেরই একটা ছোট্ট প্রতিচ্ছবি।
যে মানুষ ভ্যানওয়ালার সাথে বসে চা খেতে পারে, যে মানুষ সবজিওয়ালার কাঁধে হাত রেখে কুশল জিজ্ঞেস করতে পারে, সে মানুষ আসলে রাজনীতি করে না, সে মানুষ সমাজ গড়ে। পদ পদবীর মোহ তাকে টানেনি কখনো। তিনি জানেন, ক্ষমতা আসে যায়, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা টিকে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। বঙ্গবন্ধু বলতেন, রাজনীতি করি মানুষের জন্য। এই একটি বাক্য যদি কারো জীবনে সত্যি হয়ে ওঠে, তবে সেই জীবন ব্যর্থ হতে পারে না।
আজ তার জন্মদিন। একটা মানুষের জন্মদিন মানেই শুধু আনন্দের দিন নয়, এটা একটা পর্যালোচনার দিনও। পেছনে ফিরে তাকানোর দিন, সামনে এগোনোর সংকল্পের দিন। রাছেলের জীবনের এই বাইশ বছরের রাজনৈতিক পথচলায় ওঠাপড়া কম হয়নি নিশ্চয়ই। কিন্তু যে মানুষ পিছিয়ে পড়াদের হাত ধরে রাখে, সে মানুষ কখনো একা পড়ে না। এই কথাটাই যেন প্রমাণিত হয়েছে তার জীবনে বারবার।
তবে এই আনন্দের দিনে একটা বেদনার কথাও না বললেই নয়। সম্প্রতি তার বাবা পরলোকগমন করেছেন। একজন সন্তানের জীবনে বাবার চলে যাওয়া মানে একটা ছায়া সরে যাওয়া, একটা আশ্রয় হারিয়ে যাওয়া। যতই বয়স হোক, বাবার অনুপস্থিতি মানুষকে হঠাৎ অনেকখানি একা করে দেয়। এই শোকের মধ্যেও রাছেল যেভাবে নিজের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন, তা তার ভেতরের শক্তিরই প্রমাণ। উইনস্টন চার্চিল বলেছিলেন, সাফল্য চূড়ান্ত নয়, ব্যর্থতা মারাত্মক নয়, আসল সাহস হলো এগিয়ে চলার সাহস। রাছেলের জীবনে এই সাহসের ছাপ স্পষ্ট।
আমরা যারা তাকে চিনি, যারা তার পথচলা কাছ থেকে দেখেছি, তারা জানি এই মানুষটি থেমে যাওয়ার মানুষ নন। জন্মদিনে তার জন্য শুধু শুভকামনা নয়, একটা প্রত্যাশাও থাকল। যেন তিনি এভাবেই মানুষের পাশে থাকেন, যেন তার রাজনীতি সবসময় মানুষের জন্যই থেকে যায়। আল্লাহ তার বাবাকে জান্নাত নসিব করুন, আমীন। আর রাছেলকে দিন দীর্ঘ, সুস্থ ও অর্থবহ জীবন। করতোয়া যেমন থামে না, মানুষের জন্য কাজ করে যাওয়ার এই স্রোতও যেন তার জীবনে কখনো থেমে না যায়।
লেখক: সাংবাদিক, কবি, কথাসাহিত্যিক, কলামিষ্ট, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী।
হোয়াটসঅ্যাপ: 01718456839.