জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী গড়ার প্রত্যয় নিয়ে পঞ্চগড়ে অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হয়েছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস। এবারের দিবসের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘জলবায়ু পরিবর্তন: আজকের পদক্ষেপ, আগামীর নিরাপত্তা’। এই স্লোগানকে সামনে রেখে জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে দিনব্যাপী বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়, যা স্থানীয় মানুষের মাঝে পরিবেশ রক্ষার নতুন বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।
কর্মসূচির শুরুতে বৃহস্পতিবার দুপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। উৎসবের আমেজে ভরা এই র্যালিটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মোসাঃ শুকরিয়া পারভিন। ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে র্যালিটি জেলা শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলো ঘুরে এটি আবারও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে এসে শেষ হয়। রঙের ছোঁয়া আর পরিবেশ সচেতনতার স্লোগানে মুখরিত এই র্যালিটি শহরের সাধারণ পথচারীদেরও পরিবেশ রক্ষায় উদ্বুদ্ধ করে।
র্যালি শেষে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে একটি তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এস. এম. ইমাম রাজী টুলু। সভার শুরুতে স্বাগত বক্তব্য এবং পরিবেশের বর্তমান পরিস্থিতির ওপর আলোকপাত করেন পঞ্চগড় পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল গফুর। তিনি স্থানীয় পর্যায়ে পরিবেশ দূষণ রোধে করণীয় বিষয়গুলো তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন জেলা প্রশাসক মোছাঃ শুকরিয়া পারভীন। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচতে হলে আমাদের এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা না করতে পারলে আগামী প্রজন্ম চরম ঝুঁকিতে পড়বে। তাই গাছ লাগানো থেকে শুরু করে প্লাস্টিক বর্জন—সব ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বিশেষ অতিথি হিসেবে সভায় বক্তব্য দেন পুলিশ সুপার আবু সায়েম। তিনি আইনগত দিক এবং সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে পরিবেশের ক্ষতি রোধ করার ওপর জোর দেন। এ ছাড়া রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে বক্তব্য দেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক জাহিরুল ইসলাম কাচ্চু এবং জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য মাওলানা ইকবাল হোসাইন। বক্তারা দল-মত নির্বিশেষে পরিবেশের মতো একটি জাতীয় ও বৈশ্বিক সংকটে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।
পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও সভায় জোরালো বক্তব্য তুলে ধরা হয়। পঞ্চগড় সবুজ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মোঃ রাশেদুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের পক্ষ হতে সরকার হায়দার পরিবেশ সুরক্ষায় মাঠপর্যায়ের নানা অভিজ্ঞতা ও সংকটের কথা তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, শুধু দিবসভিত্তিক কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সারা বছরই পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন চালু রাখতে হবে।
এই যৌথ আয়োজনে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, পরিবেশকর্মী, গণমাধ্যমকর্মী এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। বিশেষ করে পরিবেশবাদী সংগঠন পঞ্চগড় সবুজ আন্দোলন (পসা), বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), কারিগর এবং বিডি ক্লিন এর নেতাকর্মী ও প্রতিনিধিদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি অনুষ্ঠানটিকে প্রাণবন্ত করে তোলে। তরুণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো, যা আগামীর সবুজ পৃথিবীর স্বপ্নকে আরও দৃঢ় করে।
আলোচনা সভায় উপস্থিত বক্তারা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৈশ্বিক উষ্ণতা হ্রাস, বৃক্ষরোপণ বৃদ্ধি এবং প্লাস্টিক দূষণ রোধে বিভিন্ন দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন। তাঁরা স্পষ্ট করেন যে, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সর্বস্তরের মানুষের আন্তরিক সহযোগিতা ছাড়া পরিবেশ রক্ষা করা অসম্ভব।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আয়োজিত বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া বিজয়ী শিশু ও শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্রেস্ট ও বিশেষ পুরস্কার বিতরণ করা হয়। পুরস্কার হাতে বিজয়ী শিক্ষার্থীদের হাসিমুখ উপস্থিত সবাইকে আনন্দিত করে। সবশেষে পরিবেশের প্রতি ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে পঞ্চগড় সবুজ আন্দোলনের পক্ষ হতে অনুষ্ঠানে আগত সবার মাঝে ফলদ, বনজ ও ওষুধি গাছের চারা বিতরণ করা হয়। চারা বিতরণের এই মানবিক ও কল্যাণকর উদ্যোগের মধ্য দিয়েই দিবসের কর্মসূচির সফল সমাপ্তি ঘটে।