আই জামান চমক, icrbd24: করতোয়ার জল একসময় টলটলে ছিল। মাছ দেখা যেত তলা পর্যন্ত। সেই জলে কতজন সাঁতার শিখেছে, কতজন তৃষ্ণা মিটিয়েছে। নদী কখনো জিজ্ঞেস করেনি, তুমি আমার কী করলে। নদীর স্বভাবই এটা। দেওয়া। শুধু দেওয়া। মানুষও এমন হয়। কেউ কেউ।
দেবীগঞ্জের সাংবাদিকতার ইতিহাস ঘাঁটলে কিছু মানুষের নাম আসে, যাদের ছাড়া সেই ইতিহাস অসম্পূর্ণ। জাকির হোসেন রাজু মামা, প্রয়াত এনামুল ভাই, ভাউলাগঞ্জের জাদু ভাই, কাউয়ূম ভাই — এঁরা শুধু নাম নন, এঁরা একটা যুগ। একটা মাটি। যে মাটিতে পা রেখে পরবর্তী প্রজন্ম হাঁটতে শিখেছে। রাহাত হাসান রনি ভাই, মোজাহারুল ইসলাম জিন্নাহ রানা ভাই — এঁরাও দশ সালের আগেই কলম-ক্যামেরা তুলে নিয়েছিলেন। তাঁদের সাথে কাজ করেছি। স্নেহ পেয়েছি। শ্রদ্ধা দিয়েছি। সেই আদান-প্রদানে কোনো হিসাব ছিল না। ছিল শুধু পারস্পরিক সৌজন্য — যেটা সাংবাদিকতার একটা অলিখিত ঐতিহ্য।
সেই ঐতিহ্য কি এখন বোঝা হয়ে গেছে কারো কারো কাছে?
এবিএম সোহেল রশিদ একবার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে বলেছিলেন, যে পেকে যাবে সে ঝড়ে যাবে, এর আগেও যারা পেকে গিয়েছে তারা ঝড়ে গিয়েছে। কথাটা সেদিন হয়তো রূপক মনে হয়েছিল। এখন দেখছি কাছে থেকে — কেউ কেউ পাকতে পাকতে পচে যাচ্ছে। পার্থক্যটা সূক্ষ্ম। পাকলে মিষ্টি গন্ধ বের হয়। পচলে বের হয় দুর্গন্ধ। আর দুর্গন্ধ কখনো নিজে টের পাওয়া যায় না — পাশের মানুষই টের পায়।
বয়োজ্যেষ্ঠ গুণী মানুষদের তাচ্ছিল্য করা একটা বিশেষ ধরনের মূর্খতা। এটা শুধু অকৃতজ্ঞতা নয়, এটা আত্মঘাতী। আরিস্টটল বলেছিলেন, যে মানুষ সমাজের বাইরে থাকতে পারে সে হয় পশু, নয়তো দেবতা। পশু হওয়া সহজ। কিন্তু পশু হয়ে সাংবাদিক পরিচয় বহন করা — এটা কঠিন, বেশিদিন টেকে না।
আমি নিজেকে কচুরিপানার ফুলের সাথে তুলনা করি। জলেই সুন্দর। ঘরে আনলে শুকিয়ে যায়। আমার সীমাবদ্ধতা আমি জানি। কিন্তু এটাও জানি, কচুরিপানার ফুল জলকে কখনো অস্বীকার করে না। যে জলে সে ভাসে, সেই জলের প্রতি তার একটা নীরব কৃতজ্ঞতা আছে।
নজরুল লিখেছিলেন, বনের পাখিরে কে চিনে রাখে গান হলে অবসান। সত্যি কথা। কিন্তু তাই বলে পাখির গান তো থেমে যায় না। যারা গান শুনিয়েছে, তাদের অবদান মুছে যায় না। ইতিহাস নিজেই লিপিকার।
আমার গুরু বলেছিলেন, প্রতিশোধ নিতে নেই। আমি সে পথে হাঁটিনি। কিন্তু প্রকৃতির নিজস্ব বিচার আছে। সেটা দেরিতে আসে, কিন্তু নিখুঁতভাবে আসে। ইংরেজিতে একটা কথা আছে, What goes around comes around। আমাদের দেশে বলে, গাছ যেদিকে হেলে, ঐদিকেই পড়ে। কিন্ত আমি কাউকে ক্ষমা করলে মন থেকেই করি। ভালোবাসলে সত্যিই বাসি। ভুলকে ভুলে গিয়ে বরং নতুন ফোটা ফুলকেই গুরুত্ব দেই।
তাচ্ছিল্য করতে চাইলে করো। এড়িয়ে যেতে চাইলে যাও। পথ অনেক। কিন্তু মনে রেখো — যাঁরা এই মাটিতে শিকড় গেড়েছেন, তাঁদের অবমাননা মাটিকেই অবমাননা করা। আর মাটি সব মনে রাখে। মাটির কাছে কিছু লুকানো যায় না।
চার্চিল বলেছিলেন, একজন মানুষের চরিত্র বোঝা যায় সে ক্ষমতায় থাকলে কীভাবে আচরণ করে তা দেখে। আমি বলব, চরিত্র বোঝা যায় সে পূর্বসূরিদের সাথে কেমন ব্যবহার করে তা দেখে। পূর্বসূরিরা পথ তৈরি করেন। উত্তরসূরিরা সেই পথে হাঁটে। পথকে অস্বীকার করলে পথিক হওয়া যায় না, পথভ্রষ্ট হওয়া যায়।
ফলাফল শূন্য হওয়ার আগেই থামা উচিত। পাকা ধানে মই দিলে ফসল মেলে না — শুধু ধুলো ওড়ে।
লেখক: সাংবাদিক, কবি, কথাসাহিত্যিক, কলামিষ্ট, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী। হোয়াটসঅ্যাপ: 01718456839