আই জামান চমক: শীত আসার আগে তিস্তার চরে একরকম ফ্যাকাশে আলো নামে। জল সরে যায়, বালু জেগে ওঠে, আর দূর থেকে দেখলে মনে হয় নদীটা যেন ক্লান্ত হয়ে একটু জিরিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু যারা এই নদীর পাড়ে বড় হয়েছে, তারা জানে, তিস্তা কখনো থামে না। সে শুধু নিচে নিচে বইতে থাকে। কেউ দেখে না, তবু বয়ে চলে।
অক্টোবরের উনিশ তারিখ ছিল আব্দুল মালেক ভাইয়ের জন্মদিন। আয়না নিউজের সম্পাদক ও প্রকাশক, রংপুর মহানগর এনসিপির সদস্য সচিব। পরিচয় অনেক, কিন্তু আমার কাছে তিনি প্রথমত মালেক ভাই। আমার আইডল। আমি তাকে ফলো করতে চাই, কিছুটা করিও।
আমি খুব ভাগ্যবান। জীবনে শ্রেষ্ঠ মানুষদের দেখা পেয়েছি, কাছে বসেছি, কেউ কেউ আমাকে আপনও করে নিয়েছেন। তবু সবাইকে ছাপিয়ে একজন মানুষ আমার তাত্ত্বিকতার খোলস ভেঙে একেবারে ব্যবহারিক জীবনটাকেই বদলে দিয়েছেন। বই পড়ে অনেক কিছু জানা যায়, কিন্তু মানুষ দেখে যা শেখা যায়, তার ওজন আলাদা।
তাঁর জন্মদিনে কী লিখব, কীভাবে লিখব, ভাবতে ভাবতে একটার পর একটা ড্রাফট দাঁড় করালাম। কাটলাম। আবার লিখলাম। আবার কাটলাম। শেষে মনে হলো, এই মানুষটাকে নিয়ে বিশেষ কিছু লেখা বোধ করি আমার সাধ্যের বাইরে। প্রশংসা করতে গেলে কমতিই থেকে যায়। তাই আজ শুধু স্মৃতি আর কৃতজ্ঞতা। আর একটা দোয়া: জন্মদিন বারবার আসুক, তিস্তার স্রোতের মতোই বহমান এই মানুষটির জীবনে। কবিগুরু লিখেছিলেন, যে নদী হারায়ে স্রোত চলিতে না পারে, সহস্র শৈবালদাম বাঁধে আসি তারে। মালেক ভাই সেই নদী নন। তাঁর স্রোত থামে না।
তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় রংপুরের আলোকিত মানুষ রফিকুল ইসলাম সাবুল ভাইয়ের হাত ধরে। কবি, কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিক্ষক, সংগঠক ও গবেষক সাবুল ভাই নিজেই একটা গোটা পাঠশালা। সেটা ছিল আমার দুঃসময়। ঘূর্ণিবায়ুতে উড়তে উড়তে কুটোর মতো গিয়ে ঠেকলাম তাঁর কাছে। তিনি সব শুনে বললেন, “চিন্তা কোরো না। বেলা এগারোটায় আমি তোমাকে ভাইয়ের কাছে নিয়ে যাব। ব্যবস্থা হয়ে যাবে।”
সাবুল ভাই সত্যিই পথপ্রদর্শক। তিনি আমাকে ঠিক মানুষটির কাছেই নিয়ে গিয়েছিলেন।
আজ যে আমি বেঁচে আছি, আমার সন্তানকে যে বাঁচিয়ে রাখতে পারছি, তার পিছনে ঠিক কতটা অবদান আব্দুল মালেক ভাইয়ের- তা আমিই জানি। সেদিন তাঁর হাত বেয়েই যেন আসমান থেকে নেমে এসেছিল খোদার রহমত। এ কথা বলতে গেলে গলাটা এখনো ভারী হয়ে আসে। তাই কথা বাড়াই না। শুধু বলি, কৃতজ্ঞতা শব্দটা এই ঋণের কাছে বড্ড ছোট।
প্রথম দেখাতেই মুগ্ধ হয়েছিলাম। তাঁর কথার ভেতরে এমন একটা জাদু আছে যে শুনতে শুনতে সময় ফুরিয়ে যায়। আমি প্রতিদিন যাওয়া আসায় তিরিশ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে ছুটে যেতাম শুধু তাঁর কথা শোনার জন্য। এভারেজ মানুষ তিনি নন। সেটা তাঁর চেহারায়, চলনে, বলনে, সবখানে।
আমি আই জামান চমক, একটু স্বতন্ত্র ধাঁচের মানুষ। সহজে কেউ আমাকে প্রভাবিত করতে পারে না। অথচ মালেক ভাইয়ের বাক্য বাছাই আর উপস্থাপনের ভঙ্গি কীভাবে যেন আমার ভেতরে বসে গেছে। আমি এখন যে সুরে কথা বলি, সেটা আসলে তাঁর। জীবন জটিল হয়ে উঠলে নিজেকে বলি, মালেক ভাইয়ের মতো করে ভেবে দেখি। অমনি আবেগ একপাশে সরে যায়, মেদহীন একটা সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসে। রাগে মাথা গরম হলে নিজেকেই জিজ্ঞেস করি, মালেক ভাই হলে এখন কী করতেন? তারপর সেভাবেই ভাবি। কেউ কি বিশ্বাস করবে, একজন মানুষ আরেকজনের ভাবনার ভেতর এভাবে বাসা বাঁধতে পারে?
আমি সহজে কাউকে নেতা মানতে পারি না। মানি না। কিন্তু মালেক ভাইকে মানি, শ্রদ্ধায়। রংপুরের গণমানুষের মুখপাত্র তিনি, স্বভাবনেতা। নেতৃত্ব তাঁকে কেউ পরিয়ে দেয়নি, ওটা তাঁর গায়ে মিশে আছে।
আমার মেয়েটা আমার মতোই দুরন্ত। ওকে সামলাতে গিয়ে বেশ ধকল যায়। গলা চড়াতে গেলেই কানে বাজে মালেক ভাইয়ের সেই কথা: “চমক, শোন! বাচ্চাকে আর কোনোদিন ধমকও দিবি না। দিলে কী হয় জানিস? হার্ডডিস্কে যেমন ব্যাড সেক্টর পড়ে, প্রতিটা ধমকে ওর ব্রেইনেও তেমন চিরস্থায়ী ব্যাড সেক্টর পড়বে।” কত সহজ উপমা, অথচ কী গভীর। কঠিন কথা এত সহজে যিনি বোঝাতে পারেন, তিনিই পারেন মানুষকে প্রভাবিত করতে। তিস্তা পাড়ের দুঃখী মেহনতী মানুষ তাই তাঁকে বিশ্বাস করে। তাঁর ডাকে সাড়া দিতে প্রস্তুত থাকে রংপুর সিটির মানুষ। তাঁর চোখ দিয়েই এই জনপদ আধুনিক রংপুরের স্বপ্ন দেখে।
খাবার মনমতো না হলে আমার মেজাজ বিগড়ে যেত। এখনো মাঝে মাঝে যায়। তখনই একটা দিনের কথা মনে পড়ে। সাবুল ভাই, আমি আর অফিসের স্টাফরা মিলে বসেছি, বিরিয়ানির অর্ডার হলো। রংপুরে তখন নতুন একটা বিরিয়ানির দোকান খুলেছে, সেখান থেকেই আনা হলো। খেতে বসে আমার মেজাজ চড়ে গেল। ভাবলাম, এবার মালেক ভাইও ক্ষোভে ফেটে পড়বেন। স্টাফ সজীব মুখ ফুটে বলেই ফেলল, “খুব বাজে। এটা কীভাবে বিরিয়ানি হলো?” মালেক ভাই খুব নরম গলায় বললেন, “শুকরিয়া আদায় কর। অনেকের সামনে এই খাবারটুকুও নেই।”
সেদিনের পর থেকে আমি আর খাবার নিয়ে অভিযোগ করি না। যিনি মুখে শেখান না, যাঁকে দেখেই শিখে নিতে হয়, তিনিই তো আসল সমাজ সংস্কারক।
স্মার্ট হওয়া কাকে বলে, সেটাও শিখেছি তাঁর কাছেই। কোনো প্রতিক্রিয়া না দিয়েও যে নীরবে অনেক কিছু বলা যায়, সেটা শিখেছি আরেকটা ঘটনায়। তখন আমের মৌসুম। বিকেলে আম খাওয়ানোর কথা। দুই সজীব ডেস্কের ওপরেই আম ছিলতে শুরু করল, আর তাদের অসাবধানতায় রস ছিটকে চারদিক মাখামাখি। আমি ভাবলাম, এই বুঝি তাঁর দরাজ কণ্ঠ গর্জে উঠল। রাগ না করুন, অন্তত বলবেন, “দেখে কাজ করতে পারিস না?” কিন্তু না। তিনি দেখেও না দেখার ভান করে এড়িয়ে গেলেন। ওই নীরবতার ভেতরে কত হাজার কথা ছিল, আমি আজও পড়তে পারি। নিজের বাস্তব জীবনেও তা কাজে লাগাই। আমাদের লোকজ্ঞান বলে, যে সহে সে রহে। মালেক ভাইকে দেখলে সেই কথার মানে পরিষ্কার হয়।
মনীষীদের কথা বাদ দিলে খুব কম মানুষের কথা আমি বাসায় এত আগ্রহ নিয়ে আলোচনা করি। আমার সহধর্মিণী শাহানার সঙ্গে প্রতিদিন বাসায় ফিরে অনেকক্ষণ ধরে মালেক ভাইয়ের গল্প করতাম। তাঁর একটা বাজরিগার পাখি ছিল। পাখিটা তাঁর ডেস্কের মনিটরের ওপর বসে থাকত, আর তাঁর মুখ থেকে পান খেত। শাহানার মুখে গল্পটা শুনে আমার মেয়েটাও এখন জানে।
গাছ, মাছ আর পাখি, এই তিনটা ছিল তাঁর প্রাণ। ব্যবসার কাজে দুবাই গেলেও প্রতিদিন ফোন করে স্টাফদের কাছে খোঁজ নিতেন, গাছগুলো কেমন আছে, মাছগুলো আর পাখিটা কেমন কেমন আছে। ভিডিও কলে নিজের চোখে দেখেও নিতেন। এমন মানুষের কাছে একটা পাখি কী, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না।
সেই পাখিটাকেই একবার হারিয়ে ফেললেন চিরতরে। তিনি কয়েক দিনের জন্য ঢাকায় গিয়েছিলেন। ফিরে এসে দেখেন, পাখি নেই। স্টাফরা কোনো সদুত্তর দিতে পারল না। আমি ভাবলাম, এবার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙবেই। কিন্তু ভাঙল না। টুঁ শব্দটি করলেন না। একদম কিছুই বললেন না। আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। বাসায় গিয়ে বলতেই শাহানাও অবাক হয়ে গিয়েছিল। যে মানুষ পাখির জন্য এত ভাবেন, তিনিই পাখি হারিয়ে নীরব। কাউকে দোষ দিলেন না, শাস্তিও দিলেন না। ওই নীরবতার ওজন আমি আজও মাপতে পারিনি। মন খারাপ-দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। কিন্ত নীরব ই থাকলেন।
মালেক ভাইয়ের প্রসঙ্গ এলেই শাহানা মনে করিয়ে দেয় তাঁর সঙ্গে ওর একমাত্র দেখা হওয়ার দিনটির কথা। মালেক ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হবে, কিন্তু তিনি তখন অফিসে নেই। অপেক্ষার সময়টুকু শাহানা ছাদবাগান ঘুরে দেখছিল। খবর এল, ভাই নিচে এসেছেন। শাহানা সিঁড়ি বেয়ে নামছে, মনে মনে সালাম দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ঠিক তখনই সেই ক্রিস্টাল ক্লিয়ার গলা শোনা গেল, “আসসালামু আলাইকুম। আপু, কেমন আছ?” শাহানা যারপরনাই বিস্মিত। ওর ভাষ্য, “আমাকে দেখার আগেই সালাম দিয়ে দিলেন কীভাবে? তিঁনি তো আমাকে চিনেনও না। বুঝলেন কিভাবে যে আমিই?”
এমন টুকরো টুকরো ঘটনা বলতে গেলে মহাকাব্য হয়ে যাবে। ন্যায়ের পক্ষে রাজপথের প্রতিবাদ, মঞ্চে দাঁড়িয়ে নীতির কথা, দুর্জনের হুমকিকে তোয়াক্কা না করে সত্যটা উচ্চারণ করা। এসবও আছে। কিন্তু আজ ওসব থাক। আজ শুধু বলি, তাঁর কাছে আমি নানাভাবে ঋণী।
খুব কাছ থেকে দেখে বুঝেছি, তিনি চাইলে রংপুরকে আন্তর্জাতিক মানের শহর বানিয়ে দিতে পারেন। সেই ভিত্তি আছে তারঁ ভিতরে। তাঁর ভাবনা আর অভিজ্ঞতা একদমই আলাদা, একদমই ব্যবহারিক। কৌশল, রাজনীতি, সহ্য, উদারতা, আর প্রয়োজনে কঠোরতা, এসব কেমন দেখতে হয়, আমি দেখেছি তাঁর কাছেই। যেটুকু শিখেছি তা ধরে রেখেছি, আরও শিখতে চাই।
আদিম মানুষের পথ ধরে আসা আধুনিক মননের এক মানুষ আব্দুল মালেক। একদম সাধারণ, অথচ এক অসাধারণ ব্যক্তিসত্তা। আমার ভাষায়, মানুষকে বিস্মিত করার মানুষ। আমাদের সমাজে এমন মানুষ আরও বেশি দরকার। তবে আমরা কি তাঁদের সময় থাকতে চিনতে পারি? নাকি হারিয়ে ফেলার পর খুঁজে মরি?
মালেক ভাই, বলতে চাই আপনার মতো। চলতে চাই আপনার মতো। বাঁচতে চাই আপনার মতো। হাঁটতে চাই আপনার পথে। সুস্থ থাকুন, অনেক দিন বেঁচে থাকুন।
আর হ্যাঁ, খুব মিস করি আপনার কণ্ঠের সেই ডাক: “এই চমক! সজীবকে উপরে পাঠিয়ে দে।”
লেখক: সাংবাদিক, কবি, কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী।
হোয়াটসঅ্যাপ: 01718456839