আইসিআরবিডি টোয়েন্টিফোর icrbd24: নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার নাউতারা ইউনিয়নের আকাশকুড়ি গ্রামের দুলাল হোসেনের ছেলে জামাল উদ্দিন। বয়স মাত্র ৩৫ বছর। অথচ আজ তিনি শয্যাশায়ী, শরীরজুড়ে অসহ্য যন্ত্রণা আর চোখে মুখে মৃত্যুর আতঙ্ক। পরিবারের অভিযোগ, চিকিৎসার নামে ভুল সিদ্ধান্ত ও অবহেলার কারণেই তার সামান্য ক্ষত ভয়াবহ অবস্থায় পৌঁছেছে।
রোগীর ছেলের ভাষ্য অনুযায়ী জানা গেছে, রোগীর কোমরের নিচের দিকে সামান্য একটি ক্ষত থেকেই জামাল উদ্দিনের দুর্ভোগের শুরু। ক্ষত ধীরে ধীরে বড় হতে থাকলে রংপুরসহ বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা নেন তিনি। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হওয়ায় একপর্যায়ে স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক মো. আলাকুল ইসলামের শরণাপন্ন হন।
অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে ওই চিকিৎসক ক্ষতটি ড্রেসিংসহ বিভিন্ন চিকিৎসা দিয়ে জামাল উদ্দিনের কাছ থেকে ধীরে ধীরে পর্যায়ক্রমে প্রায় ৩০-৪০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন কৌশলে। পরবর্তীতে ক্ষতস্থানে ক্যান্সারের আশঙ্কা দেখিয়ে সেখান থেকে মাংস কেটে বায়োপসি করার পরামর্শ দেন বলে অভিযোগ মজিদের।
পল্লী চিকিৎসকের প্রেসক্রিপসন প্যাডে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয়ের সঙ্গে L.M.A.F.P, Diploma-in-Medicine, Mother & Child Surgery এবং ICDDR’S (Dhaka) উল্লেখ রয়েছে। একই প্যাডে তাকে Life Care Hospital & Diagnostic Center, Dimla, Nilphamari-এর Director হিসেবেও পরিচয় দেওয়া হয়েছে। তবে এসব সনদ, প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতার সরকারি স্বীকৃতি এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা-নিবন্ধন রয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে চিকিৎসা কার্যক্রমের আইনগত কাঠামোয় নিবন্ধিত চিকিৎসক ও স্বীকৃত চিকিৎসা-যোগ্যতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। BM&DC নিজেই চিকিৎসক নিবন্ধন এবং চিকিৎসা-যোগ্যতা স্বীকৃতির দায়িত্ব পালন করে।
আরও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে, একজন পল্লী চিকিৎসক রোগীর শরীর থেকে মাংস কেটে বায়োপসি পরীক্ষার জন্য পাঠানোর মতো সার্জিক্যাল কার্যক্রম করার আইনগত ও পেশাগত অধিকার রাখেন কি না। প্রচলিত আইনি কাঠামোয় medical practice-এর মধ্যে surgical operation ও pathological examination-সহ বিভিন্ন চিকিৎসাসেবা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং registered medical practitioner বলতে সংশ্লিষ্ট আইনের অধীনে নিবন্ধিত ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, জামাল উদ্দিনের কাছ থেকে ৬ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়ার পর ক্ষতস্থান থেকে তিন টুকরো মাংস কেটে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানোর কথা বলা হয়। কিন্তু এরপর প্রায় এক মাস চার দিন পেরিয়ে গেলেও পরিবারের হাতে কোনো বায়োপসি রিপোর্ট পৌঁছেনি বলে দাবি করা হয়েছে।
এরই মধ্যে ক্ষতস্থানে পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করে এবং রোগীর শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতির দিকে যায়। রোগীর পুত্র জানায়, ক্ষতটি ভয়াবহ আকার ধারণ করে বর্তমানে জামাল উদ্দিন প্রায় মৃত্যুশয্যায়।
রোগীর একমাত্র সন্তান মজিদ নবম শ্রেণির ছাত্র। মা শিশুকালেই তাদের ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। বাবার চিকিৎসা ও সেবার দায়িত্ব এখন এই কিশোর সন্তানের কাঁধে। অসহায় বাবার পাশে বসে থাকা সন্তানের চোখে একটাই প্রশ্ন, আমার বাবাকে কি বাঁচানো যাবে?
তার অভিযোগ, বায়োপসি রিপোর্টের পরিবর্তে পরবর্তীতে ওই ডাক্তারের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ভুয়া সিবিসি রিপোর্ট দেওয়া হয়। বিষয়টি মজিদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করলে সংবাদকর্মীদের জানানো হয়।
অভিযোগটি প্রকাশ্যে আসার পর সংশ্লিষ্ট পল্লী চিকিৎসক রোগীর ছেলেকে টাকা ফেরত দিয়ে বিষয়টি মীমাংসার অনুরোধ করেছেন বলেও মজিদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
এদিকে স্থানীয়দের প্রশ্ন, একজন অসহায় রোগীর শরীর থেকে মাংস কাটা হলো কীভাবে? সেটি কোথায় পরীক্ষা করা হলো? বায়োপসি হয়ে থাকলে রিপোর্ট কোথায়? এবং পরে ভুয়া সিবিসি রিপোর্ট কেন দেওয়া হলো?
এটি শুধু জামাল উদ্দিনের পরিবারের প্রশ্ন নয়, এটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসংখ্য দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার প্রশ্ন। চিকিৎসার নামে কোনো অনভিজ্ঞ বা অননুমোদিত ব্যক্তির হাতে নিজের জীবন তুলে দেওয়ার আগে তাই সতর্ক হওয়া জরুরি।
চিকিৎসকের নিবন্ধন, যোগ্যতা ও প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যাচাই করা প্রত্যেক রোগীর অধিকার। BM&DC-এর ওয়েবসাইটে নিবন্ধিত চিকিৎসক যাচাইয়ের ব্যবস্থাও রয়েছে।
জামাল উদ্দিনের করুণ পরিণতির দায় কার, তা তদন্তেই নির্ধারিত হোক। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত জরুরি। কিন্তু একজন অসহায় রোগী যেন আর কখনো চিকিৎসার নামে মৃত্যুর দিকে না ঠেলে দেওয়া হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় দাবি।
এ বিষয়ে শয্যাশায়ী জামাল উদ্দিনের একমাত্র ছেলে আব্দুল মজিদ বলেন, আমি তো আমার বাবার এই অবস্থার জন্য দায়ী পল্লী চিকিৎসক মো. আলাকুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিচার দাবি করি। কিন্তু তিনি সুকৌশলে আমাদের বাড়িতে এসে আমার দাদী ও অসুস্থ বাবার হাত ধরে নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। পরে আমার বাবা ও দাদী তাঁকে ক্ষমা করে দিয়েছেন বলে আমাকে জানিয়েছেন। এ কারণে এখন আমি আর কিছু করতে পারছি না। তবে আমার বাবার যে অবস্থা হয়েছে, তা একজন সন্তান হিসেবে মেনে নেওয়া আমার জন্য অত্যন্ত কষ্টের।
পল্লী চিকিৎসক মো. আলাকুল ইসলাম অভিযোগের বিষয়ে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঘটনার কথা স্বীকার করে বলেন, আমার ভুল হয়েছে। আমি রোগীর ছেলে আব্দুল মজিদের হাতে ছয় হাজার টাকা ফেরত দিয়েছি।
সুতরাং উভয় পক্ষের বক্তব্য তাঁদের ভাষ্য হুবহু উপস্থাপন করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর চিকিৎসাগত ও আইনগত সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই হওয়া প্রয়োজন মনে করছেন স্থানীয়রা।
এডিটর: আই জামান চমক। হোয়াটসএ্যাপ: 01718456839