দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার দলুয়া বাজার সংলগ্ন প্রাণনগর ২ নম্বর কলোনী এলাকায় এক চাঞ্চল্যকর ঘটনায় বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য ও দেশীয় অস্ত্রসহ সুলতান নামের এক কুখ্যাত মাদক কারবারিকে আটক করেছে স্থানীয় জনতা। শুক্রবার ভোর আনুমানিক ৫টার দিকে এই ঘটনা ঘটে। আটককৃত সুলতানের বয়স ৩৫ বছর এবং সে ওই এলাকার কেরামত আলীর ছেলে। দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় তার বেপরোয়া মাদক কারবারের কারণে স্থানীয় সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের চাপা ক্ষোভ ও গভীর উদ্বেগ বিরাজ করছিল।

এলাকার বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে জানা গেছে, প্রত্যন্ত এই পল্লী অঞ্চলের মাদক কারবারের মূল হোতা সুলতানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই মানুষের ক্ষোভ জমছিল। শুক্রবার ভোরের আলো ফোটার আগেই স্থানীয় গ্রাম পুলিশ এবং সচেতন এলাকাবাসী ঐক্যবদ্ধ হয়ে সুলতানের বাসভবন চারদিক থেকে ঘেরাও করে। এরপর তারা তার বাড়ি থেকে ১০টি ফেন্সিডিলের খালি বোতল, ৯০ পিস নিষিদ্ধ ট্যাপেন্ডাল ট্যাবলেট, মাদক সেবনের বিভিন্ন কারিগরি সরঞ্জাম এবং আত্মরক্ষার্থে বা সন্ত্রাসী কার্যকলাপে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে রাখা ১টি ধারালো রামদা ও ১টি ছোড়াসহ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করে। বিপুল পরিমাণ এই আলামতসহ এলাকার কুখ্যাত এই অপরাধীকে সাধারণ মানুষ হাতেনাতে ধরে ফেলে।
এই ঘটনার পেছনে একটি অত্যন্ত অমানবিক ও বিয়োগান্তক প্রেক্ষাপট রয়েছে বলে জানা গেছে। একটি স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, সুলতানের মাদক কেনাবেচায় বাধা দেওয়ার কারণে সে একই এলাকার প্রতিবাদী যুবক প্রত্যয়কে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যায়। এরপর তার ওপর সারা রাত ধরে অমানবিক শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। এই নির্যাতনের শিকার প্রত্যয় হলেন একই এলাকার সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান এবং জামায়াতের নায়েবে আমির এ কে এম কাউসারের ছেলে। এক যুবকের ওপর এমন নির্মম ও শৃঙ্খলহীন নির্যাতনের খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো গ্রামবাসী ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং তারা এই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। যুবকের ওপর নির্যাতনের ঘটনাটিই মূলত এলাকাবাসীকে এক মঞ্চে নিয়ে আসে এবং তারা মাদক কারবারির বিরুদ্ধে এই প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
ঘটনার খবর পেয়ে বীরগঞ্জ থানার এসআই দিনেশের নেতৃত্বে পুলিশের একটি চৌকস টিম দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। এ সময় উত্তেজিত জনতা অপরাধীর শাস্তির দাবিতে স্লোগান দিচ্ছিল। পুলিশ কর্মকর্তা দিনেশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করে অভিযুক্ত সুলতানকে আলামতসহ নিজেদের হেফাজতে নেন। এরপর পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে বীরগঞ্জ থানায় নিয়ে আসে এবং তার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মামলা রেকর্ড করা হয়। পরবর্তীতে তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে।
এই আইনবিরোধী তৎপরতা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম ক্ষতিকর মাদক কারবারের বিরুদ্ধে স্থানীয় সর্বস্তরের মানুষ এখন একতাবদ্ধ। এলাকার বিশিষ্ট ক্রীড়াবিদ, সংগঠক ও সম্ভাব্য ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী মোশাররফ হোসেনসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিগণ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা প্রকাশ করেছেন। তারা বলেন, প্রত্যন্ত পল্লী অঞ্চলে মাদকের এমন বিস্তার সাধারণ মানুষকে মারাত্মকভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। তরুণ সমাজকে রক্ষা করার তাগিদেই আজ সবাই দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন এবং এই বেপরোয়া কারবারিকে আইনের হাতে সোপর্দ করতে সহযোগিতা করেছেন। তারা আরও স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, সমাজ থেকে এই বিষাক্ত উপাদান দূর না হওয়া পর্যন্ত মাদকের বিরুদ্ধে জনতার এই কঠোর অবস্থান ও সামাজিক প্রতিরোধ আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।
বীরগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ সাইফুল ইসলাম পুরো ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আটককৃত মাদক কারবারি সুলতান আলীর নামে বীরগঞ্জ থানায় একটি সুনির্দিষ্ট মামলা দায়ের করা হয়েছে। তিনি এলাকার আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক শান্তি বজায় রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করে দৃঢ়তার সাথে বলেন যে, মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের এই কঠোর অভিযান বর্তমানে চলমান রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এটি অব্যাহত থাকবে। সমাজে শান্তি ফিরিয়ে আনতে এবং মাদক নির্মূলের এই লড়াইয়ে কোনো ধরনের অপরাধীকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না।