আই জামান চমক: করতোয়ার জল যেমন বাধা পেলে পথ বদলায় না — কেবল আরও বেগে ছোটে, দেবীগঞ্জের মাটিতে এমন কিছু মানুষ জন্মায় যারা ঝড়ে নুয়ে পড়ে না। সাদিকুজ্জামান হীরা তেমনই একজন — যার নামটা উচ্চারণ করতে গেলে বুকের ভেতর একটা সম্মানের অনুভব জেগে ওঠে।
আমি তাঁকে চিনি কাছ থেকে। সেদিনের কথা আজও ভুলিনি — আব্বার লাশের জন্য বরফ সংগ্রহ করতে গিয়ে যখন দিশাহারা হয়ে পড়েছিলাম, হীরা ভাই এগিয়ে এসেছিলেন এমনভাবে, যেন আমার রক্তের ভাই। সেই মুহূর্তে তিনি আমাকে শুধু বরফ দেননি — একটুকরো মানবতা দিয়েছিলেন। এই যে নিঃস্বার্থ উপস্থিতি — এটা রাজনীতির বইয়ে শেখানো হয় না, এটা মানুষের জন্মগত গুণ।
একদিন কথায় কথায় তিনি বললেন — শত্রুর জন্যও তিনি মঙ্গল কামনা করেন। কথাটা সেদিন একটু অবাক করেছিল। কিন্তু এখন মনে হয়, এই কথাটাই তাঁর পরিচয়ের সবচেয়ে সৎ দলিল। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “যে সহিষ্ণু সে-ই সত্যিকারের শক্তিমান।” হীরা ভাইয়ের মধ্যে সেই শক্তি আমি দেখেছি।
কিন্তু সেই মানুষটার উপর যখন সন্ত্রাসী হামলা হয় — তখন প্রশ্ন জাগে, এই সমাজের বিবেক কোথায় গেল? যে মানুষ শত্রুকেও ক্ষমা করেন, তাঁকে শারীরিকভাবে আঘাত করার প্রয়োজন কোন ক্ষুদ্রতা থেকে জন্মায়? ধরে নিলাম, হীরা ভাইয়ের কোনো দোষ ছিল — কিন্তু সেই দোষের বিচার কি মারপিটের মাধ্যমে হয়? তাঁর সংগঠনের কাছে অভিযোগ জানানো যেত। আইনের দরজায় কড়া নাড়া যেত। সভ্য সমাজে বিরোধ মেটানোর পথ একটাই — আইন ও বিবেক। লাঠি নয়।
হীরা ভাই প্রতিবাদী — এটা সত্য। আর প্রতিবাদী মানুষ বেশিরভাগেরই বিরাগভাজন হন। এটাও সত্য। শহীদ জিয়ার আদর্শ বুকে ধারণ করে যখন বিএনপির চরম দুঃসময়ে অনেকেই দলের পরিচয় লুকিয়ে রেখেছিল — তখন হীরা রাজপথে দাঁড়িয়েছিলেন। হাজারো পুলিশি হামলা, মামলার ভার বহন করেছেন — তবু মাথা নত করেননি। এমন মানুষ তৈরি হয় না এক দিনে। এদের গড়ে তোলে কষ্ট, নীতি আর বিশ্বাস।
আর এই মুহূর্তটা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তারেক রহমান যখন প্রধানমন্ত্রীর পথে — তখন বিএনপির প্রতিটি কর্মীর দায়িত্ব আরও বেশি। এই সময়ে দলের ভেতর বা বাইরে কেউ যদি নিজের হাতকে অস্ত্র বানায় — সে কেবল একজন মানুষকে আঘাত করে না, সে দলের ভাবমূর্তিতে কালি ছিটায়। জনগণ এখন দেখছে — বিএনপি ক্ষমতায় গেলে কী করবে, সেটার আভাস তারা এখনই পাচ্ছে। মারপিটের রাজনীতি আওয়ামী আমলের কলঙ্ক ছিল — সেই কলঙ্ক যেন নতুন পোশাকে ফিরে না আসে।
দেবীগঞ্জ থানার পুলিশের কাছে আমার একটাই প্রত্যাশা — অপরাধীরা যে পরিচয়েরই হোক, আইনের দাঁড়িপাল্লায় তাদের বিচার হোক। কারণ আইন যদি শুধু দুর্বলের জন্যই কাজ করে — তাহলে সেটা আইন নয়, সেটা ক্ষমতার আরেকটি মুখোশ।
হীরা ভাই — আপনি আঘাত পেয়েছেন, কিন্তু আপনার আদর্শ আঘাত পায়নি। করতোয়ার স্রোত থামে না, পঞ্চগড়ের মাটির মানুষও থামে না। আপনি সেরে উঠুন — দেবীগঞ্জের মানুষের অনেক কথা বলার আছে, সেই কথা বলার মানুষ আপনাকেই হতে হবে।
লেখক: সাংবাদিক, কবি, কথাসাহিত্যিক, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী। হোয়াটসএ্যাপ: 01718456839।