icrbd24 আইসিআরবিডি টোয়েন্টিফোর, আই জামান চমক: করতোয়ার জল যখন দেবীগঞ্জের বুক চিরে বয়ে যায়, তখন সে শুধু জলই বহন করে না, বহন করে একটা জনপদের স্মৃতি, একটা মানুষের নাম। সেই মানুষটির নাম আবু তোরাব সরকার। দেবীগঞ্জ যাকে ডাকত তোরাব চেয়ারম্যান বলে। মুকুট ছিল না মাথায়, তবু মানুষ তাকে সম্রাটের আসনেই বসিয়েছিল হৃদয়ে। রাজনীতির রঙ তার গায়ে ছিল ঠিকই, বিএনপির পতাকা তিনি বহন করেছিলেন আমৃত্যু, দেবীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি এবং পরে আহবায়ক হিসেবে। কিন্তু মানুষ দেখার চোখটা তার দলীয় ছিল না। এইটুকু পার্থক্য গড়ে দেয় একজন রাজনীতিবিদ আর একজন জননেতার মধ্যে।
তাই তো বিস্ময় জাগে না যখন শুনি, আওয়ামী লীগের শাসনামলেও করতোয়া পারের মানুষ তাকে ভোট দিয়েছে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায়। রাজনীতি তখন প্রতিপক্ষ খোঁজে, মানুষ খোঁজে না। তোরাব চেয়ারম্যান বোধহয় সেই বিরল মানুষদের একজন ছিলেন, যাকে মানুষ ভোট দিয়েছে দলের হিসাবে নয়, ভালোবাসার হিসাবে।
আমি নিজে দেখেছি তাকে। ছোটবেলার সেই স্মৃতি আজও স্পষ্ট। আব্বাকে একদিন তিনি বলেছিলেন, মৌলভীর ব্যাটা রবিনহুড হবে। কথাটা শুনতে সহজ, কিন্তু একজন মানুষের চোখে আরেকজনের ভবিষ্যৎ দেখতে পাওয়ার ক্ষমতা সহজ নয়। আমি রবিনহুড হতে পারিনি। কলম হাতে নিয়েছি, তলোয়ার নয়। তবু সেই আশীর্বাদটা কোথাও রয়ে গেছে, শব্দ হয়ে, লেখা হয়ে।

আর আজ যখন দেবীগঞ্জের মাটিতে দাঁড়িয়ে দেখি ফরিদ সরকারকে, মনে হয় সময় যেন একটা বৃত্ত সম্পূর্ণ করছে। বাবার ছায়া পুত্রের গায়ে পড়ে, কখনো কখনো এতটাই গাঢ় হয়ে যে চেনা কঠিন হয়ে পড়ে কে আসলে কার প্রতিচ্ছবি। ফরিদ সরকার বলেন, বাবার কাছে এই জনপদের মানুষের যেমন প্রত্যাশা ছিল, তেমনি আমার রক্তের সাথেও এই এলাকার মানুষের ভালোবাসার ঋণ মিশে আছে। কথাটা শুনতে শুনতে মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথের সেই কথা, দান করিলে বাড়ে বই কমে না। তোরাব চেয়ারম্যান আজীবন যা বিলিয়ে গেছেন মানুষের মধ্যে, তা কমেনি, বরং সুদে আসলে ফিরে এসেছে তার সন্তানের ভাগ্যে।
দুচোখ দিয়ে মানুষ দেখার যে পাঠ, ফরিদ সরকার বলেন সেটা তিনি শিখেছেন বাবার কাছেই। এক চোখে দল, আরেক চোখে মানুষ, এই বিভাজনটাই তো আমাদের রাজনীতির আসল ব্যাধি। যে নেতা এক চোখ বন্ধ রাখেন প্রতিপক্ষের প্রতি, তিনি কখনো পুরো জনপদের নেতা হতে পারেন না। ফরিদ সরকার সেই পথে হাঁটেননি। গতবার তিনি নির্দলীয়ভাবে টেবিলফ্যান প্রতীকে দাঁড়িয়েছিলেন, জেলা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেই। আর এবারও, দেবীগঞ্জ সদর ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে তিনি দাঁড়াচ্ছেন স্বতন্ত্র হয়েই।
প্রশ্ন জাগে, কেন বারবার স্বতন্ত্র? দলের ছাতার নিচে থাকলে তো পথ সহজ হয়। কিন্তু কিছু মানুষ থাকেন যারা ছাতার নিচে নয়, খোলা আকাশের নিচে দাঁড়াতে ভালোবাসেন, বৃষ্টি মাথায় নিয়েই। সে ঝুঁকি সবাই নিতে পারে না। যারা নেয়, তাদের পেছনে সাধারণত একটাই কারণ থাকে, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা দলের প্রতি আনুগত্যের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে।

আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি ফরিদ সরকারকে। বয়সে ও সম্পর্কে আমি তার জুনিয়র হলেও তিনি আমাকে ভালোবেসেছেন বন্ধুর মতোই। এই মানুষটাকে যারা চেনেন তারা জানেন, তিনি সবাইকে বন্ধু বানিয়ে নেন, দলিল নয়, হৃদয় দিয়ে। কৃষক, শ্রমিক, কুলি, মজুর, ভ্যানচালক, সবজি বিক্রেতা, এমনকি ফুচকাওয়ালার কাছেও তিনি একই মর্যাদা নিয়ে যান। এইটুকু ছোট্ট অভ্যাস আসলে ছোট নয়। এরিস্টটল বলেছিলেন, মানুষ স্বভাবতই রাজনৈতিক প্রাণী। কিন্তু রাজনীতি যদি মানুষকে ছোট বড় করে দেখা শেখায়, তবে সেই রাজনীতি মানবতার বিপরীতে দাঁড়ায়। ফরিদ সরকার যেন সেই বিপরীত স্রোতেই হাঁটছেন, নীরবে।
দেবীগঞ্জের মাটি বড় অদ্ভুত। এই মাটি মনে রাখে। ভুলে যায় না সহজে। করতোয়ার পাড়ে বসে যে বৃদ্ধ কৃষক আজও তোরাব চেয়ারম্যানের নাম নেন শ্রদ্ধায়, তিনিই আবার ফরিদ সরকারের কাঁধে হাত রেখে বলেন, বাবার মতো হও। এই প্রত্যাশা এক অর্থে বোঝা, আরেক অর্থে সৌভাগ্য। বোঝা এই কারণে যে তুলনা সবসময় কঠিন। সৌভাগ্য এই কারণে যে সেই তুলনার সুযোগটাই অনেকে পায় না।

নির্বাচন আসে, নির্বাচন যায়। প্রতীক বদলায়, স্লোগান বদলায়। কিন্তু মানুষের ভালোবাসা অর্জনের কোনো শর্টকাট নেই, এই সত্যটা তোরাব চেয়ারম্যান বুঝেছিলেন, আর তার ছেলে যেন সেই বোঝাপড়াকেই এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন প্রজন্মান্তরে। কাজী নজরুল লিখেছিলেন, মহাজনের মহৎ কথা তাই সবার কাছে সত্য হয়ে ওঠে যখন তা জীবনে প্রমাণিত হয়। ফরিদ সরকারের রাজনীতি যদি সত্যিই পিতার আদর্শের প্রতিচ্ছবি হয়, তবে দেবীগঞ্জের মানুষ আরেকবার সেই প্রমাণের সাক্ষী হতে যাচ্ছে।
আমি জানি না ভোটের ফল কী হবে। ফলাফল লেখে জনতা, কলম নয়। কিন্তু এইটুকু বলতে পারি, একটা জনপদ যখন কোনো পরিবারকে বারবার ভালোবাসা দিয়ে বেছে নেয়, দলের বাইরে গিয়ে, তখন সেই ভালোবাসার পেছনে কারণ খুঁজে দেখা দরকার। দেবীগঞ্জের মানুষ সেই কারণ জানে। হয়তো ভোটের বাক্সেই আবার লিখে দেবে সেই পুরনো ঋণের কথা, রক্তের ঋণ নয়, ভালোবাসার ঋণ।
লেখক: সাংবাদিক, কবি, কথাসাহিত্যিক, কলামিষ্ট, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী।
হোয়াটসঅ্যাপ: 01718456839