আইসিআরবিডি টোয়েন্টিফোর icrbd24: নীলফামারীর ডিমলায় তিস্তা নদী থেকে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন কোনোভাবেই থামছে না। দিনের আলো ফোটার আগেই নদীর বুক চিরে শ্যালো মেশিনের সাহায্যে পাথর উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, গত কয়েক মাস ধরে অর্ধশতাধিক নৌকা নামিয়ে রাতের আঁধারে এ অবৈধ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এতে একদিকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ, নাব্যতা ও তীরবর্তী জনপদের পরিবেশ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
ভোররাতে কিসামত চরে সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, ডিমলা উপজেলার খগাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের কিসামত ছাতনাই মৌজার চরাঞ্চল সংলগ্ন তিস্তা নদীতে রাত গভীর হলে সক্রিয় হয়ে ওঠে পাথর উত্তোলনকারীরা। অভিযোগ রয়েছে, রাত ১২টার দিকে পাথর উত্তোলনের নৌকাগুলো নদীতে নামানো হয়। এরপর ভোর পর্যন্ত শ্যালো মেশিন চালিয়ে নদীর তলদেশ থেকে পাথর উত্তোলন করা হয়। সকাল ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে উত্তোলন করা পাথরসহ নৌকাগুলো সরাতে দেখা যায়। সারারাত শ্যালো মেশিনের বিকট শব্দে তিস্তা পাড়ের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। নদী সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা রাতে ঘুমাতে পারছেন না। অনেকে প্রতিবাদ করতে চাইলেও প্রভাবশালী পাথর উত্তোলনকারীদের ভয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন না।

স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, কিসামত ছাতনাই চরকে কেন্দ্র করে পাথর উত্তোলনে একটি বড় চক্র সক্রিয় রয়েছে। কিসামত চরের বাসিন্দা নুরুল হকের ছেলে আব্দুল আজিদ, রেজাউল আলমের ছেলে আপেল ও আলমগীর, দোহলপাড়া গ্রামের আব্দুর রশিদের ছেলে মো. মন্ডল, সেরাজুল ইসলামের ছেলে গোলজার রহমান, জামাল উদ্দিনের ছেলে সাইদুল, সমছের আলীর ছেলে তৈয়বুল ইসলাম, ছাতনাই কলোনি গ্রামের আছর উদ্দিন, রবির ছেলে তনজিবুল, আক্তার উদ্দিনের ছেলে শাহিনুর, আকরামের ছেলে হাসু এবং টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের চরখড়িবাড়ী গ্রামের করিম, আইনুল ও মজিবুলসহ আরও অনেকে এ কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন। সরেজমিনে উল্লেখিত ব্যক্তিদের পাথর উত্তোলন করতে দেখা গেছে।
পাথর উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত বলে স্থানীয়ভাবে পরিচিত কয়েকজনের বক্তব্য আরও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। আপেল, আজিদ ও আলমগীরের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তারা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং বিজিবির বার্নিঘাট ক্যাম্পকে ম্যানেজ করে পাথর উত্তোলন করছেন। তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের যোগাযোগ রয়েছে বলেও তারা দাবি করেছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এমনকি তিস্তা নদী থেকে পাথর উত্তোলনে কেউ বাধা দিতে পারবে না বলেও তারা দম্ভোক্তি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা বিজিবির কোনো কর্মকর্তা অর্থের বিনিময়ে অবৈধ পাথর উত্তোলনকারীদের সহযোগিতা করছেন কি না, তা স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি নদীর তলদেশ থেকে পরিকল্পনাহীন ও নির্বিচারে পাথর এবং বালু উত্তোলন নদীর স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। নদীর কোথাও অতিরিক্ত গভীরতা তৈরি হলে স্রোতের গতিপথ পরিবর্তিত হতে পারে। এতে তীরভাঙন বাড়তে পারে, নদীর গতিপথ অস্থিতিশীল হতে পারে এবং বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে পানি প্রবাহের স্বাভাবিক চরিত্র বদলে যেতে পারে। তিস্তা এমনিতেই ভাঙন, পলি জমা, চর জাগা ও নাব্যতা সংকটসহ নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর মধ্যে নদীর তলদেশ থেকে যত্রতত্র পাথর উত্তোলন চলতে থাকলে ভবিষ্যতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও নাব্যতা আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নদীর তলদেশে শ্যালো মেশিনের মাধ্যমে দীর্ঘসময় খনন চললে তলদেশের গঠন পরিবর্তিত হওয়ার পাশাপাশি আশপাশের চর ও তীরবর্তী এলাকার ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। ফলে বিষয়টি শুধু অবৈধ পাথর উত্তোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি তিস্তা নদীর পরিবেশ ও নদী ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, সারারাত নদীতে শ্যালো মেশিনের বিকট শব্দ হয়। নদীর কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। কিন্তু প্রভাবশালীদের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না। পাথর উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে কথা বললে বিভিন্নভাবে হয়রানির আশঙ্কা রয়েছে। ফলে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ থাকলেও অনেকে প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে সাহস করছেন না। স্থানীয়দের দাবি, তিস্তা নদীকে রক্ষা করতে হলে শুধু মাঝে মাঝে অভিযান চালালেই হবে না। রাতের আঁধারে পাথর উত্তোলনের নৌকা, শ্যালো মেশিন, পাথর পরিবহন এবং এর পেছনের অর্থনৈতিক চক্র চিহ্নিত করে স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। সেই সঙ্গে নদীতে থাকা নৌকাগুলো প্রশাসনের অভিযানে খুঁজে বের করে ধ্বংস করে ফেলতে হবে।
রাতের আঁধারে তিস্তা নদী থেকে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের অভিযোগের বিষয়ে ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, বিষয়টি দুঃখজনক। তবে টাস্কফোর্স ছাড়া তিস্তা নদীতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তিনি জানান, অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের ব্যাপারে উপজেলা প্রশাসন জিরো টলারেন্স অবস্থানে রয়েছে। এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধে টাস্কফোর্সের মাধ্যমে অভিযান অব্যাহত থাকবে। তিনি পরামর্শ দিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্মিলিতভাবে অবৈধ পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রয়োজনে স্থানীয় বাসিন্দারা গণস্বাক্ষরসহ লিখিত অভিযোগ করতে পারেন। সেখানে পাথর উত্তোলনকারীদের পাশাপাশি যারা এ কার্যক্রমের পেছনে সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, তাদের নামও উল্লেখ করা যেতে পারে।
তিস্তা নদীকে বাঁচাতে হলে অবৈধ পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান, নৌকা ও শ্যালো মেশিন জব্দ, জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা এবং অর্থনৈতিক লেনদেনের উৎস অনুসন্ধানের পাশাপাশি নদীর তলদেশের বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ জরুরি। বিশেষ করে রাতের আঁধারে নদীতে নৌকা নামিয়ে পাথর উত্তোলনের সুযোগ কীভাবে তৈরি হচ্ছে, কারা এসব নৌকার মালিক, পাথর কোথায় যাচ্ছে, কারা কিনছে এবং এর সঙ্গে কোনো প্রভাবশালী মহল বা অসাধু চক্র জড়িত কি না, তা গভীরভাবে তদন্তের দাবি রাখে।
স্থানীয়দের মতে, তিস্তা শুধু একটি নদী নয়, এটি ডিমলার মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি, পরিবেশ ও ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। নদীর বুক থেকে অবাধে পাথর তুলে নেওয়া চলতে থাকলে আজ হয়তো লাভবান হবে একটি চক্র, কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির বোঝা বহন করতে হবে নদী ও নদীপাড়ের সাধারণ মানুষকে। তাই তিস্তার স্বাভাবিক গতিপথ ও নাব্যতা রক্ষা করতে হবে সকলকেই। নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে অবৈধ পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান, ধারাবাহিক ও নিরপেক্ষ অভিযান এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ যদি অবৈধ কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করে থাকে, তদন্তের মাধ্যমে তা চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
এডিটর: আই জামান চমক। হোয়াটসএ্যাপ: 01718456839