আইসিআরবিডি টোয়েন্টিফোর icrbd24: কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার কালাকচুয়া এলাকায় এখন এক অভিনব অপরাধের রাজত্ব চলছে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে সাধারণ কোনো পুরাতন লোহালক্কড় বা ভাঙারির দোকান, কিন্তু এর আড়ালে চলছে চোরাই মালামালের এক বিশাল বেচাকেনা। স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে চুরি যাওয়া লাখ লাখ টাকার মোটর, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও লোহার সামগ্রী নিয়মিত এই দোকানগুলোতেই হাতবদল হচ্ছে। আর এই চোরাই বাণিজ্যের টাকা সরাসরি গিয়ে পড়ছে মাদক সেবনকারীদের পকেটে, যার ফলে পুরো এলাকায় সামাজিক অপরাধ চরম আকার ধারণ করেছে।

অথচ এত বড় একটি অপরাধ চক্র দিনের আলোতে সক্রিয় থাকলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো দৃশ্যমান তৎপরতা নেই। ক্ষুব্ধ স্থানীয়দের অভিযোগ, অসাধু কিছু সদস্যের পকেটে নিয়মিত মাসোয়ারা বা ঘুষের টাকা পৌঁছানোর কারণেই এই ভাঙারি দোকানগুলো যেন আড়ালে একরকম দায়মুক্তি পেয়ে গেছে।
সরেজমিনে কালাকচুয়া এলাকায় গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের একেবারে পাশেই গড়ে ওঠা এই এলাকায় অন্তত ১৫ থেকে ১৬টি এমন ভাঙারি দোকান রয়েছে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে শুধু আশপাশের এলাকাই নয়, দূর-দূরান্ত থেকেও চুরি করা মালামাল খুব সহজেই এখানে এনে স্তূপ করা হচ্ছে।

এসব দোকানে মূলত দুই ধাপে মালামালের হাতবদল ঘটে থাকে। প্রথমে স্থানীয় টোকাইরা বিভিন্ন জায়গা থেকে কুড়িয়ে আনা লোহালক্কড় বিক্রি করে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এই সাধারণ কেনাবেচার আড়ালেই সরাসরি চোর চক্র তাদের চুরি করা মূল্যবান সামগ্রী এসব দোকানে নির্ভয়ে বিক্রি করে যাচ্ছে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সোহেল মিয়া, ইসলাম মিয়া, মফিজ উদ্দিন, আবুল হাশেম, বাবুল মিয়া, নুরু, ইউসুফ, রুবেল, হানিফ ও জয়নালসহ বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী নিয়মিত এই পুরাতন মালামাল কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত। এদের মধ্যে ভাঙারি ব্যবসায়ী বাবুল মিয়া ও আবুল হাশেম স্থানীয়ভাবে বেশ প্রভাবশালী। তারা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নামমাত্র মূল্যে পছন্দের মালামাল কিনে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এমনকি কেউ তাদের কাছে মালামাল বিক্রি করতে না চাইলে তাকে ভয়ভীতি দেখানো বা মারধরের মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে।
দায়িত্বশীল একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, ময়নামতি ইউনিয়নের হরিণধরা, দেবপুর, শরীফপুর ও রামপুর এলাকার কয়েকটি পরিত্যক্ত স্টিল মিলে একটি সংঘবদ্ধ চোর চক্র বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা রাতের বেলা কারখানার দেয়াল কেটে মূল্যবান মোটর ও লোহার সামগ্রী চুরি করে আনছে। আর এসব মালামালের বড় একটি অংশ সরাসরি কালাকচুয়ার এই ভাঙারি দোকানগুলোতেই বিক্রি করা হচ্ছে।
সূত্রটির তথ্যমতে, টোকাই ও চোর চক্রের কাছ থেকে সংগ্রহ করা এই বিপুল পরিমাণ চোরাই মালামাল সপ্তাহ বা মাসের শেষে অন্তত ১৫ থেকে ২০টি ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার করে দেওয়া হয়। সম্প্রতি আশপাশের বেশ কয়েকটি চুরির ঘটনার পর অনুসন্ধান চালিয়ে স্থানীয়রা নিশ্চিত হয়েছেন যে, চুরি যাওয়া ওইসব মালামাল এই দোকানগুলোতেই বিক্রি হয়েছে।
চুরির খতিয়ানও বেশ দীর্ঘ। স্থানীয়রা জানান, মাধাইয়া জলা এলাকার প্রয়াত কন্ট্রাক্টর আলী আশরাফের ডিপ মেশিনের দুটি ট্রান্সফরমার, প্রবাসী সোলাইমানের পানির পাম্প, সুবেদার শাহজাহানের লোহার কল এবং মধ্যম শাহদৌলতপুর মসজিদের লোহার কল চুরি গেছে। এখানেই শেষ নয়, ময়নামতির শেষেশপুর, ঝুমুর ও রামমাল এলাকার বিভিন্ন বসতবাড়ি থেকে বৈদ্যুতিক মোটর ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি চুরির ঘটনাও প্রতিনিয়ত ঘটছে।
এরই মধ্যে কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের ময়নামতির দেবপুর এলাকায় অবস্থিত মাবিয়া স্টিল মিলস নামের একটি কারখানায় অভিনব চুরির ঘটনা সামনে এসেছে। বেসরকারি একটি ব্যাংকের কাছে দায়বদ্ধ এই কারখানাটি থেকে রাতের আঁধারে দেয়াল কেটে মূল্যবান মোটর ও যন্ত্রাংশ সরিয়ে নিচ্ছে একটি চক্র। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, চুরির পর ভাঙা দেয়ালটি আবার ইট ও সিমেন্ট দিয়ে সুন্দরভাবে সংস্কার করে দেওয়া হচ্ছে, যাতে বাইরে থেকে কেউ কিছু বুঝতে না পারে।
কারখানাটি ব্যাংকের কাছে দায়বদ্ধ থাকলেও এর ভেতরের সম্পদ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। প্রধান ফটকে ব্যাংকের দায়বদ্ধতার একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়েই যেন তারা নিজেদের দায়িত্ব শেষ করেছেন, আর এই সুযোগটাই কাজে লাগাচ্ছে চোর চক্র।
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে ভাঙারি ব্যবসায়ী বাবুল মিয়ার সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। ফলে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
দিন দিন এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। স্থানীয় মানুষের এখন একটাই দাবি, চোরাই মালামাল কেনাবেচা চিরতরে বন্ধ করতে অবিলম্বে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হোক। ভাঙারি দোকানগুলোর মালামালের সঠিক উৎস যাচাই করা এবং চুরি হওয়া পণ্য শনাক্তে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। তা না হলে ভাঙারি ব্যবসার আড়ালে চলা এই চুরির সিন্ডিকেট এবং মাদকের বিস্তার স্থানীয় সমাজ ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেবে।
এডিটর: আই জামান চমক। হোয়াটসএ্যাপ: 01718456839