আই জামান চমক, icrbd24: ১৫ আগস্ট। ভোরের কুয়াশা এখনো কাটেনি, তবু বাতাসে যেন একটা ভারী নিঃশ্বাস টের পাওয়া যায়। টুঙ্গিপাড়ার মধুমতি নদী আজও বয়ে চলে আগের মতোই, কিন্তু তার স্রোতের মধ্যে মিশে থাকে এক অব্যক্ত কান্না। বাংলাদেশের মাটি প্রতি বছর এই দিনে একটু বেশি নীরব হয়ে যায়, যেন সে নিজেও শোক পালন করছে।
আজ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যা দিবস। এই নামটি উচ্চারণ করলেই একটা ইতিহাস চোখের সামনে ভেসে ওঠে, একজন মানুষের ইতিহাস যিনি একটা জাতিকে জন্ম দিয়েছিলেন নিজের সমস্ত জীবন বাজি রেখে। আপনি যে দলের হোন, যে মতের মানুষ হোন না কেন, বঙ্গবন্ধুকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো পথ নেই। তাকে ছোট করার যত চেষ্টা হয়েছে, ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে তিনি ততই বড় হয়ে উঠেছেন। কারণ বাংলাদেশ মানেই মুজিব। মুজিবকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের কোনো গল্প সম্পূর্ণ হয় না।
কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ত্রো একবার বলেছিলেন, আমি হিমালয় দেখিনি, বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি। এই একটি বাক্যেই বোঝা যায় মানুষটির উচ্চতা কতখানি ছিল। যিনি নিজে একটি বিপ্লবের নায়ক, তিনি যখন আরেকজনকে হিমালয়ের সাথে তুলনা করেন, তখন সেটা নিছক ভদ্রতা নয়, সেটা স্বীকৃতি। মার্কিন কূটনীতিক হেনরি কিসিঞ্জারও বলেছিলেন, আগামী বিশ বছরে এশিয়া মহাদেশে শেখ মুজিবুর রহমানের মতো তেজী ও গতিশীল নেতা আর পাওয়া যাবে না। যে মানুষটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবেও পরিচিত ছিলেন, তিনিও এই সত্য অস্বীকার করতে পারেননি।
কিন্তু ইতিহাস বড় নিষ্ঠুর। যে মানুষটি বাঙালিকে একটি রাষ্ট্র উপহার দিলেন, তাকেই এক পঁচাত্তরের ভোরে নিজের বাড়িতে, নিজের মানুষদের হাতে প্রাণ হারাতে হলো। বিবিসি সে সময় লিখেছিল, শেখ মুজিব নিহত হলেন তার নিজেরই সেনাবাহিনীর হাতে, অথচ পাকিস্তানিরাও তাকে হত্যা করতে সংকোচ বোধ করেছিল। এই একটি বাক্য যেন গোটা ট্র্যাজেডির গভীরতা বুঝিয়ে দেয়। যে শত্রু তাকে মারতে দ্বিধা করেছিল, সেই মানুষটিকে মারল তারই আপনজন।
সে সময়ের বিশ্বনেতারা যেন কেউই এই আঘাত সামলাতে পারেননি। ফিদেল ক্যাস্ত্রো আরেকবার বলেছিলেন, শেখ মুজিবের মৃত্যুতে বিশ্বের শোষিত মানুষ হারাল তাদের একজন মহান নেতাকে, আর তিনি নিজে হারালেন একজন অকৃত্রিম বিশাল হৃদয়ের বন্ধুকে। ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত বলেছিলেন, আপোষহীন সংগ্রামী নেতৃত্ব আর কুসুমকোমল হৃদয়, এই দুটোই ছিল মুজিব চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। একজন মানুষের মধ্যে কঠোরতা আর কোমলতা একসাথে থাকা, এটাই বোধহয় আসল নেতৃত্বের পরিচয়।
ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, শেখ মুজিব নিহত হওয়ার খবরে তিনি মর্মাহত হয়েছিলেন, কারণ তার অসাধারণ সাহসিকতা এশিয়া ও আফ্রিকার মানুষের জন্য প্রেরণা ছিল। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্য জেমস লামন্ড বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডে শুধু বাংলাদেশ এতিম হয়নি, বিশ্ববাসী হারিয়েছে একজন মহান সন্তানকে। এই কথাগুলো পড়লে বোঝা যায়, শোকটা শুধু একটি দেশের ছিল না, ছিল গোটা মানবতার।
দ্য গার্ডিয়ান তাকে বর্ণনা করেছিল এক বিস্ময়কর ব্যক্তিত্ব হিসেবে। ফিনান্সিয়াল টাইমস লিখেছিল, মুজিব না থাকলে বাংলাদেশ কখনোই জন্ম নিত না। আর নিউজউইক তাকে আখ্যা দিয়েছিল পয়েট অফ পলিটিক্স নামে, রাজনীতির কবি। সত্যিই তো, একজন মানুষ যিনি ভাষণ দিয়ে একটা জাতিকে যুদ্ধে নামাতে পারেন, তার চেয়ে বড় কবি আর কে হতে পারে।
ভারতীয় বেতার আকাশবাণী পনেরোই আগস্টের পরদিন এক অসাধারণ মন্তব্য করেছিল। তারা বলেছিল, যিশু মারা গেছেন, এখন লক্ষ লক্ষ মানুষ ক্রুশ ধারণ করে তাকে স্মরণ করছেন, একদিন মুজিবও হবেন যিশুর মতো। জাপানের একজন মুক্তিযোদ্ধা সমর্থক ফুকিউরা আজও বাঙালি দেখলে বলে বেড়ান, তোমাদের জয় বাংলা দেখেছি, শেখ মুজিব দেখেছি, এশিয়ায় তার মতো সিংহহৃদয় নেতার জন্ম হবে না বহুকাল।
আর মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের সেই আক্ষেপের কথা মনে পড়লে বুক ভারী হয়ে আসে। তিনি বলেছিলেন, তোমরা আমারই দেওয়া ট্যাংক দিয়ে আমার বন্ধু মুজিবকে হত্যা করেছ, আমি নিজেই নিজেকে অভিশাপ দিচ্ছি। একটি রাষ্ট্রপ্রধান যখন নিজের অস্ত্র বিক্রির জন্য নিজেকে দায়ী ভাবেন, তখন বোঝা যায় ক্ষতিটা কত গভীর ছিল।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক দৃশ্যটা বোধহয় জার্মানির সেই এয়ারপোর্টের। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা যখন পাসপোর্ট দেখান, ইমিগ্রেশন অফিসার নাকি বলে ওঠেন, ছিঃ, তোমরা বাংলাদেশিরা এত জঘন্য জাতি, যে মানুষটি তোমাদের স্বাধীনতা দিলেন তাকেই হত্যা করলে। সেই মুহূর্তে শাড়ি পরা এক নারী এয়ারপোর্টের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। এই দৃশ্যটা কল্পনা করলে আজও গা শিউরে ওঠে।
আজ পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু প্রশ্নটা এখনও রয়ে গেছে, আমরা কি সেই ঋণ শোধ করতে পেরেছি? একটা জাতি যাকে রাষ্ট্র দিয়েছেন, তাকে আমরা কতটা মনে রাখি প্রতিদিনের জীবনে? শুধু একটা দিন শোক পালন করাই কি যথেষ্ট, নাকি তার স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তোলার দায়িত্বটাও আমাদের কাঁধে বর্তায়?
মওলানা ভাসানী একবার বলেছিলেন, টুঙ্গিপাড়ার শেখ মুজিবের কবর একদিন তীর্থস্থানের মতো রূপ নেবে। আজ সেই ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হয়েছে। কিন্তু কবর তীর্থস্থান হওয়াই যথেষ্ট নয়, তার আদর্শও যেন আমাদের হৃদয়ে তীর্থস্থান হয়ে থাকে, সেটাই হোক এই শোকের দিনের প্রার্থনা।
লেখক: সাংবাদিক, কবি, কথাসাহিত্যিক, কলামিষ্ট, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী।
হোয়াটসঅ্যাপ: 01718456839.