পঞ্চগড়ের বিস্তৃত মাঠজুড়ে এখন সোনালী ধানের দোল আর সুবাসে ভরে উঠেছে চারপাশ। দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠে কৃষকের চোখেমুখে এখন তৃপ্তির ছাপ। চলতি মৌসুমে উন্নত জাতের বোরো ধানের আবাদ করে বাম্পার ফলন পেয়েছেন জেলার প্রান্তিক চাষিরা। বিশেষ করে রোগবালাই মুক্ত এবং কম খরচে অধিক ফলনশীল জাতের ধান চাষে সফলতা পেয়ে তারা এখন দারুণভাবে উৎফুল্ল। প্রতিকূলতাকে জয় করে ফসলের এমন ভালো ফলন কৃষকদের দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের সফল পরিণতি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এবার জেলার পাঁচটি উপজেলায় মোট ৩২ হাজার ৭৩২ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে। চলতি মৌসুমের শুরু থেকেই আবহাওয়া ফসলের জন্য বেশ অনুকূলে রয়েছে। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, সময়মতো সঠিক পরিচর্যা এবং আবহাওয়া সহায়ক থাকায় ধানের গাছগুলো বেশ ভালোভাবে বেড়ে উঠেছে। মাঠের ফসল বর্তমানে খুবই সবল ও সতেজ অবস্থায় রয়েছে। কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত মাঠ পর্যায়ে গিয়ে কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছেন এবং ফসলের সার্বিক অবস্থা তদারকি করছেন।
সম্প্রতি জেলার বেংহারি ও আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর পানবারা এলাকায় বায়ারের অ্যারাইজ এজেড ৬৪৫৩ এসটি নামক উন্নত জাতের ধানের মাঠ দিবস অনুষ্ঠিত হয়। এই আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা আসাদুন্নবী, আটোয়ারী উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ফরহাদ হোসেন, বায়ার ক্রপ সায়েন্সের রংপুর বিভাগের কাস্টমার কানেক্ট ম্যানেজার মোজাম্মেল হক, কাস্টমার কানেক্ট ম্যানেজার বীজ সঞ্জিত চন্দ্র সরকার, মার্কেট ডেভেলপমেন্ট অফিসার সাইফ উদ্দিন এবং পঞ্চগড় জেলার কাস্টমার কানেক্ট ম্যানেজার উর্মী চক্রবর্তীসহ সংশ্লিষ্টরা।
মাঠ দিবস ও ফসলের ফলন নিয়ে কথা হয় স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে। কৃষক সাইফুল ইসলাম জানান, আগের বছরগুলোতে শ্রমিক মজুরি, হালচাষ ও সারের উচ্চমূল্যের কারণে বোরো আবাদ করে লাভের মুখ দেখা কঠিন ছিল। কিন্তু এবার তিনি সম্পূর্ণ নতুন জাতের ধান চাষ করে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছেন। তার হিসেবে প্রতি ৩৩ শতক জমিতে খরচ হয়েছে ১৩ থেকে ১৫ হাজার টাকা, আর বিপরীতে ফলন পেয়েছেন ৩০ থেকে ৩২ মণ। শুধু তিনিই নন, তার সাফল্য দেখে এলাকার অন্যান্য কৃষকরাও উৎসাহিত হয়েছেন এবং এই জাতের ধান চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।
আরেক কৃষক শ্রীকান্তের মতে, এই জাতের ধানের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। তিনি জানান, এবার ধানের কোনো ব্লাস্ট রোগ বা পাতা মোড়ানো রোগের প্রকোপ দেখা যায়নি। বীজের অঙ্কুরোদগম থেকে শুরু করে ফসল ঘরে তোলার আগ পর্যন্ত পুরো সময়টাতে রোগবালাইয়ের কোনো উপস্থিতি ছিল না। বর্তমান বাজারে প্রতি মণ ধান ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা কৃষকদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে।

সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা আসাদুন্নবী জানান, চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত কোনো বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সংকটের মুখোমুখি হতে হয়নি কৃষকদের। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন নিয়ে তারা আশাবাদী। বিশেষ করে বায়ারের উন্নত জাতের এজেড ৬৪৫৩ এসটি ধান নিয়ে কৃষি বিভাগ দারুণ ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে। এই জাতের ধান পোকা-মাকড় ও রোগবালাই থেকে অনেকটাই মুক্ত থাকে এবং সহজে ঝরে পড়ে না। প্রতিটি গোছায় ধানের ছড়া থাকে প্রচুর এবং প্রতিটি শিষে ২৫০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত ধান পাওয়া যায়। এছাড়া ভাত সুস্বাদু হওয়ায় কৃষকদের কাছে এর চাহিদা অনেক বেশি। প্রতি শতকে প্রায় এক মণ ধান পাওয়া সম্ভব হচ্ছে, যা প্রচলিত অন্যান্য জাতের তুলনায় অনেক বেশি। সামগ্রিক দিক বিবেচনায় এবার পঞ্চগড়ের বোরো উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখছে কৃষি বিভাগ।