রফিকুল ইসলাম সাবুল, কবি ও সাংবাদিক: বাংলা সাহিত্যের বিস্তৃত প্রান্তরে প্রতিনিয়ত যুক্ত হচ্ছেন নতুন নতুন কণ্ঠস্বর। তাঁদেরই একজন কবি পারুল আক্তার পান্না।
নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার তিস্তা-পাড়ের দক্ষিণ বালাপাড়া গ্রামে জন্ম নেওয়া এই কবির সাহিত্যযাত্রা শুরু হয়েছিল স্কুলজীবনেই। পিতা মরহুম ওমর আলী সরকার ও মাতা ফাতেমা বেগমের স্নেহছায়ায় বেড়ে ওঠা পারুল আক্তার পান্না জীবনের নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করেও সাহিত্যচর্চার প্রদীপ নিভতে দেননি।
বৈবাহিক সূত্রে বর্তমানে তাঁর আবাস ঢাকাকেন্দ্রিক হলেও তাঁর সৃজনভুবনের শিকড় আজও প্রোথিত আছে মাটি, মানুষ, বিশ্বাস ও মানবিকতার গভীরে। প্রেম, সমাজ, দেশ, ধর্মচেতনা এবং সমসাময়িক জীবনবোধ তাঁর লেখার প্রধান উপজীব্য। বিশেষত আধ্যাত্মিক ও নৈতিক অনুষঙ্গ তাঁর কবিতাকে দিয়েছে স্বতন্ত্র মাত্রা।
ইতোমধ্যে তাঁর একক কাব্যগ্রন্থ ‘নিয়তি’ ও ‘অবেলার আলাপন’ প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া অসংখ্য যৌথ সংকলন ও বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকায় প্রকাশিত রচনার মাধ্যমে তিনি পাঠকমহলে পরিচিতি অর্জন করেছেন। আগামী অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে তাঁর গল্পগ্রন্থ ‘সুঁতোয় বাঁধা জীবন’, ‘ছায়ার ওপারে’ এবং কিশোরগ্রন্থ ‘বজ্রকণ্ঠ হাদী’।
কবি পারুল আক্তার পান্নার কবিতার প্রধান শক্তি তাঁর অনুভবের আন্তরিকতা। তিনি কৃত্রিম শব্দমালার জৌলুসে নয়, বরং জীবনঘন বাস্তবতা ও আত্মিক অনুরণনের মধ্য দিয়ে পাঠকের হৃদয়ে পৌঁছাতে চান। তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত অনুভূতি যেমন স্থান পায়, তেমনি মানবজীবনের চিরন্তন প্রশ্নও উঠে আসে গভীর ব্যঞ্জনায়।
‘অবেলার আলাপন’ : জীবন ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী সংলাপ
‘অবেলার আলাপন’ কবিতায় কবি এক অনন্য নাটকীয় চিত্রকল্প নির্মাণ করেছেন। “মৃত্যুপ্রহরী” এখানে কেবল মৃত্যুর প্রতীক নয়; বরং জীবনের হিসাব-নিকাশের এক অনিবার্য উপস্থিতি। কবিতার সংলাপধর্মী বিন্যাস, “ঠক ঠক ঠক, কে ওখানে?”পাঠককে মুহূর্তেই অস্তিত্ববাদী এক আবহে নিয়ে যায়। “সময়ের ইঞ্জিনে জং ধরা” কিংবা “ঝাপসা জীবনের পাণ্ডুলিপি”এসব উপমা সময়ের ক্ষয় ও জীবনের অপূর্ণতার বোধকে তীব্রভাবে প্রকাশ করেছে। কবিতার প্রবহমানতা ও নাটকীয়তা পাঠককে আত্মসমালোচনার মুখোমুখি দাঁড় করায়।
‘আনমনে ঐ মুখ’ : প্রেমের নৈঃশব্দ্য ও স্মৃতির আলোছায়া
এই কবিতাটি মূলত স্মৃতি, প্রেম ও অনুপস্থিতির কাব্য। সূর্যের আলোকে প্রিয়জনের প্রতিরূপ হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে অত্যন্ত কাব্যিক মুন্সিয়ানায়। “সকালের সূর্যের হাসি নিটোল অবিনাশী”পঙক্তিটি প্রেমের নির্মল অনুভূতিকে রূপ দিয়েছে। গোধূলি, বিকেলের রোদ, অলিন্দ, অপেক্ষা,এসব চিত্রকল্প কবিতায় এক ধরনের বিষণ্ন সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে। শব্দচয়ন কোমল, প্রবাহ মসৃণ এবং অনুভব গভীর। কবিতাটি পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী আবেগের অনুরণন জাগায়।
‘নিয়তি’ : নৈতিক মানবিকতার প্রার্থনাগাথা
‘নিয়তি’ কবিতায় কবি এক মানবিক ও নৈতিক সত্তার আর্তি ব্যক্ত করেছেন। এখানে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা কেবল ব্যক্তিগত কল্যাণের জন্য নয়; বরং দুর্নীতি, স্বৈরাচার, লোভ, অবিশ্বাস ও নৈতিক অবক্ষয় থেকে মুক্ত থাকার আকাঙ্ক্ষা। কবিতার পুনরাবৃত্তিমূলক গঠন—“হে প্রভু, কি লিখেছ নিয়তিতে জানি না”—একটি প্রার্থনাময় ছন্দ সৃষ্টি করেছে। অলংকারের ব্যবহার সংযত, অথচ তা ভাবের গভীরতাকে উজ্জ্বল করেছে। সামাজিক দায়বদ্ধতা ও আত্মশুদ্ধির আহ্বান এই কবিতাকে একটি তাৎপর্যপূর্ণ উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
‘কিন্তু তুমি??’ : প্রেম, সংযম ও আত্মিক দায়বোধ
প্রেমের কবিতা হয়েও ‘কিন্তু তুমি??’ প্রচলিত রোমান্টিকতার সীমা অতিক্রম করেছে। এখানে প্রেম কেবল দেহগত আকর্ষণ নয়; বরং আত্মিক পবিত্রতা ও নৈতিক দায়বোধের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। কবিতার বক্তব্য সরাসরি, কিন্তু আবেগ সংযত। সাময়িক কামনা ও চিরন্তন ভালোবাসার দ্বন্দ্বকে কবি অত্যন্ত সহজ অথচ মর্মস্পর্শী ভাষায় তুলে ধরেছেন। প্রেমকে আধ্যাত্মিক মর্যাদায় উন্নীত করার এই প্রচেষ্টা কবিতাটিকে বিশেষ মাত্রা দিয়েছে।
কবির কাব্যভাষা ও শিল্পরীতি
পারুল আক্তার পান্নার কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত ভাষা। তিনি জটিল শব্দের আড়ম্বর এড়িয়ে সহজ ভাষায় গভীর অনুভব প্রকাশে আগ্রহী। তাঁর কবিতায় উপমা, রূপক, প্রতীক ও চিত্রকল্পের ব্যবহার স্বাভাবিক ও প্রসঙ্গসঙ্গত। ধর্মীয় অনুষঙ্গ, মানবিক বোধ, প্রেমের অন্তর্লোক এবং জীবনদর্শনের সমন্বয়ে তিনি নির্মাণ করেছেন নিজস্ব কাব্যভাষা। তাঁর লেখায় গ্রামীণ জীবনবোধ যেমন আছে, তেমনি রয়েছে সমকালীন সমাজবাস্তবতার প্রতিফলন।
সাহিত্য কেবল শব্দের বিন্যাস নয়; এটি মানুষের আত্মার সঙ্গে মানুষের সংযোগ স্থাপনের শিল্প। সেই শিল্পের অনুশীলনে কবি পারুল আক্তার পান্না নিষ্ঠাবান এক যাত্রী।
তাঁর কলমের পথচলা আরও দীর্ঘ হোক, তাঁর কাব্যভুবন আরও সমৃদ্ধ হোক,বাংলা সাহিত্যের পাঠকসমাজের প্রত্যাশা এটাই।