দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার ভোগনগর ইউনিয়নের কালাপুকুর গ্রামে এক হৃদয়বিদারক মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র ফুটে উঠেছে। জন্ম থেকেই মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধিতার শিকার দুই ভাই আশিক ও আব্দুল আলিমকে দীর্ঘদিন ধরে বসতঘরের বারান্দায় লোহার শিকলে বেঁধে রাখা হচ্ছে। দারিদ্র্যের কষাঘাতে পিষ্ট পরিবারটির সামর্থ্য না থাকায় চিকিৎসা তো দূরের কথা, দুই প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে চরম দুশ্চিন্তা ও সীমাহীন কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন অসহায় বাবা-মা ও স্বজনেরা।
কালাপুকুর গ্রামের হতদরিদ্র দিনমজুর দেলোয়ার হোসেন গোল্ডেন ও তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা দম্পতির চার সন্তান। তাদের মধ্যে দ্বিতীয় ছেলে আশিকের বয়স এখন ১৮ বছর এবং তৃতীয় ছেলে আব্দুল আলিমের বয়স ১৫ বছর। জন্মের পর থেকেই দুই ভাই প্রতিবন্ধী। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের সামলানো কঠিন হয়ে পড়ায় বাধ্য হয়ে ঘরের বারান্দার পিলারের সঙ্গে তাদের লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। শিকলে বাঁধা অবস্থাতেই কাটে তাদের বন্দি জীবন। কঠোর নজরদারিতে থেকে এই অবর্ণনীয় ও মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে তাদের। কোনো পরিবারের জন্য এটি কতটা করুণ ও অসহনীয় বাস্তবতার গল্প, তা সরেজমিনে না দেখলে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।

প্রতিবন্ধী সন্তানদের গর্ভধারিনী মা আয়েশা সিদ্দিকা আক্ষেপ ও চোখের জল ফেলে জানান, তারা অত্যন্ত গরিব ও অসহায় মানুষ। তার স্বামী দেলোয়ার হোসেন একজন দিনমজুর এবং তিনি নিজেও বাকপ্রতিবন্ধী, স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারেন না। প্রতিদিনের দিনমজুরি থেকে পাওয়া সামান্য আয়ে কোনোমতে তাদের সংসার চলে। বিগত দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে সন্তানদের চিকিৎসা ও লালন-পালন করতে গিয়ে তারা পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। বর্তমানে দুই সন্তানের খাওয়া-দাওয়া, ওষুধ ও দেখাশোনার ব্যয় বহন করা তাদের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
অসহায় মা আয়েশা সিদ্দিকা আরও বলেন, শিকল খুলে দিলে ছেলেরা বাইরে চলে যায় এবং নিজেদের হারিয়ে ফেলে বা অনিষ্ট করে, যা সামলানো তাদের সাধ্যের বাইরে। ফলে মনের গভীরে তীব্র যন্ত্রণা ও মায়া থাকা সত্ত্বেও বাধ্য হয়ে সন্তানদের বারান্দায় শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতে হয়। শিকলে বাঁধা অবস্থাতেই তাদের গোসল ও খাওয়া-দাওয়া করাতে হয় এবং সেখানেই তারা ঘুমায়। নিজ সন্তানদের এভাবে পশুর মতো আটকে রাখা যে কত বড় কষ্টের, তা বলে বোঝানো যাবে না। এর জন্য তাদের অসংখ্য নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে।
সন্তানদের চিকিৎসা ও একটি সুস্থ জীবনের প্রত্যাশায় মা আয়েশা সিদ্দিকা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিবর্গ, স্থানীয় জাতীয় সংসদ সদস্য আলহাজ মনজুরুল ইসলাম মঞ্জু এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তিনি আকুল আবেদন জানিয়ে বলেন, সরকারের মানবিক সহায়তা ও সুচিকিৎসার ব্যবস্থা পেলে হয়তো তার দুই সন্তান সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবে এবং পরিবারটিতে কিছুটা হলেও শান্তি ফিরবে।
সকলের কাছে জীবনের শেষ আকুতি জানিয়ে এই মা বলেন, সমাজের হৃদয়বান মানুষ ও রাষ্ট্র যদি একটু সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেয়, তবে তাদের এই চরম দুর্ভোগ লাঘব হতে পারে। সামান্য সহযোগিতা একটি পুরো পরিবারকে অসহনীয় দুঃখ-কষ্ট থেকে রক্ষা করতে পারে। তিনি মহান সৃষ্টিকর্তার দয়া ও দেশবাসীর সহযোগিতা প্রার্থনা করে সন্তানদের বাঁচানোর জন্য সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।