দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার ভোগনগর ইউনিয়ন আর মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের সংযোগস্থলে পুনর্ভবা নদীর ওপর দাঁড়িয়ে আছে এক ভাঙা স্বপ্নের কঙ্কাল। গত এক যুগ ধরে এই একটি ভাঙা সেতুর কারণে হাজার হাজার মানুষের দৈনন্দিন জীবন থমকে আছে। দীর্ঘ ১২ বছর আগে যে ভোগান্তির শুরু হয়েছিল, তা আজ চরমে পৌঁছেছে। অথচ এই দীর্ঘ সময়েও সেতুটি পুনর্নির্মাণের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি চোখে পড়েনি এলাকাবাসীর। অবহেলা আর আশ্বাসের ভিড়ে এখানকার ১০ থেকে ১২টি গ্রামের মানুষের দীর্ঘশ্বাস যেন ভারী হয়ে উঠছে দিন দিন।
ঘটনার সূত্রপাত ২০১৬ সালে। প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৬ মিটার দৈর্ঘ্যের এই সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছিল এলাকাবাসীর স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে। কিন্তু বিধিবাম, নির্মাণের পরের বছরই এক ভয়াবহ বন্যায় নদীর তীব্র স্রোতে সেতুর দুই পাশের মাটি ধসে যায় এবং পুরো কাঠামোটি ভেঙে পড়ে। সেই থেকে আজ অবধি এই রুটে সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি অচল। সেতুর দুই পাশে ঝকঝকে পাকা রাস্তা থাকলেও মাঝখানে এই ভাঙা সেতুটি যেন এক বিশাল প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ফলে কোনো ধরনের যানবাহন চলাচল সম্ভব হচ্ছে না। শুষ্ক মৌসুমে কেউ কেউ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মোটরসাইকেলে পার হওয়ার চেষ্টা করলেও বর্ষাকালে এলাকাটি মূল ভূখণ্ড থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের কষ্ট এখন অসহনীয় পর্যায়ে। সেতুটি সচল থাকলে উপজেলা বা জেলা শহরে পৌঁছাতে যেখানে সামান্য সময় লাগত, সেখানে এখন ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার পথ ঘুরে যেতে হচ্ছে। এতে সময় যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি পকেট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ। বিশেষ করে এই কৃষিপ্রধান এলাকার চাষিদের অবস্থা সবচেয়ে করুণ। বীরগঞ্জের এই অঞ্চলটি সবজি উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সরাসরি যাতায়াত ব্যবস্থা না থাকায় কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য বাজারে নিতে দ্বিগুণ পরিবহন খরচ গুনতে হচ্ছে। লাভ তো দূরে থাক, অনেক সময় লোকসানের ঘানি টানতে গিয়ে কৃষকদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। সামু মিয়া বা নারায়ণ চন্দ্রের মতো কৃষকদের অভিযোগ, যাতায়াত খরচই তাদের লাভের বড় অংশ গিলে খাচ্ছে।
শিক্ষা ব্যবস্থার ওপরও এই ভাঙা সেতুর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে প্রকটভাবে। কোমলমতি শিক্ষার্থীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভাঙা সেতুর পাশ দিয়ে পারাপার হয়। বর্ষাকালে সাদিয়া খাতুন বা শিমুরানীর মতো শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়া এক প্রকার অসম্ভব হয়ে পড়ে। অনেক সময় ভেজা কাপড়েই তাদের ক্লাসে বসতে হয়, আবার অনেকে দুর্ঘটনার ভয়ে স্কুলেই যেতে পারে না। অভিভাবকদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ দীর্ঘ হচ্ছে, কারণ তাদের সন্তানদের শিক্ষা জীবন এই একটি সেতুর কারণে ব্যাহত হচ্ছে। এলাকাবাসী জনক রায় ও লিটন কুমারদের মতে, একটি মাত্র সেতু চালু হলে তাদের অন্তত ২০ কিলোমিটার পথ সাশ্রয় হতো এবং জীবনযাত্রা অনেক সহজ হতো।
জনপ্রতিনিধিরাও এই জনদুর্ভোগের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। মোহাম্মদপুর ইউপি চেয়ারম্যান গোপাল চন্দ্র দেবশর্মা এবং ভোগনগর ইউপি চেয়ারম্যান রাজিউর রহমান রাজু বর্তমান সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে জানিয়েছেন যে, এই ছোট একটি সেতুর অভাবে পুরো অঞ্চলের উন্নয়ন থমকে আছে। তারা দ্রুত এর সমাধানের দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে উপজেলা প্রকৌশলী মোঃ হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন যে, সড়ক উন্নয়নের কাজ চলছে এবং ভাঙা সেতুটি পরিদর্শন করা হয়েছে। এটি নতুনভাবে নির্মাণের পরিকল্পনা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং বরাদ্দ পেলেই কাজ শুরু হবে। স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মোঃ মনজুরুল ইসলাম মঞ্জুও বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে এলাকাবাসীর মনে প্রশ্ন—একটি সেতু ঠিক হতে কেন ১২ বছর সময় লাগে? এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার শেষ কোথায়, তা আজও তাদের অজানা। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এই অঞ্চলের অর্থনীতি ও শিক্ষার মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল।