1. info2@icrbd24.com : বার্তা বিভাগ : বার্তা বিভাগ
  2. admin@icrbd24.com : admin :
মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬, ১১:০৩ অপরাহ্ন
জুবিন গার্গ

মঞ্চে নেশা নয়, এক মহৎ শিল্পীর জীবন ও সংগ্রাম

আই জামান চমক, ঢাকা
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৫

আই জামান চমক: মানুষের জীবন এক বিচিত্র ক্যানভাস, যেখানে আলো-ছায়ার খেলা কেবল বাহিরের রূপে ধরা দেয় না, ভেতরের গভীরেও তার ছাপ পড়ে। জুবিন গার্গের মতো শিল্পীর ক্ষেত্রে তাঁর ব্যক্তিগত অভ্যাস নয়, বরং তাঁর কর্ম ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাই তাঁকে কিংবদন্তী করেছে। মঞ্চে তিনি হয়তো নেশাগ্রস্ত অবস্থায় উঠেছেন, তবুও দর্শক তাঁকে বর্জন করেনি, উল্টো তাঁকে সাদরে গ্রহণ করেছে। কেন? কারণ, মানুষ জানে, সেই নেশার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বিশাল হৃদয়, যে হৃদয় অসমীয়া জনগণের ঢাল হতে প্রস্তুত ছিল।

 

জুবিন গার্গ: অবদান ও মানবিকতার দিক

জুবিন গার্গের ব্যক্তিগত জীবন ছিল বহুবিধ সংগ্রাম ও বেদনার ফসল। তাঁর জীবনের একটি কঠিন সত্য হলো, তিনি মৃগী রোগ বা এপিলেপসি-তে ভুগছিলেন। এই ধরনের রোগ একজন মানুষের জীবনকে শারীরিকভাবে এবং মানসিকভাবে কতটা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়, তা সহজেই অনুমেয়। মৃগী রোগের যন্ত্রণা, সেই সঙ্গে বোনের মৃত্যুতে একাকীত্বে ভেঙে পড়া—এই সবকিছু মিলে তাঁর জীবনকে গভীর বিষাদের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। তবুও, সেই গভীর দুঃখকে ছাপিয়ে তিনি মানুষের জন্য বেঁচে থাকার শক্তি খুঁজে নিয়েছিলেন।

তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত জনদরদী, যাঁর কাছে ব্যক্তিগত সুখের চেয়ে সমষ্টির কল্যাণ ছিল অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আসামবাসীর উপর কোনো অন্যায়-অবিচার হলে, তিনি রুখে দাঁড়াতেন সবার আগে। তাঁর সেই সাহসিকতা ও জনগণের প্রতি অগাধ ভালোবাসাই তাঁকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল, যেখানে তাঁর ব্যক্তিগত দুর্বলতাগুলো ম্লান হয়ে গিয়েছিল। আমি অনুভব করি, এই কারণেই তাঁর প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারেরও সহজে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সাহস হতো না।

 

সংগীতে তাঁর বহুমুখী দক্ষতা

জুবিন গার্গের মূল পরিচিতি তাঁর সংগীতে। তিনি শুধু একজন গায়ক ছিলেন না, ছিলেন এক বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী (Polymath)। তাঁর গুণাবলী বা দক্ষতাগুলো কেবল গানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আমি বলতে চাই, তিনি একাধারে ছিলেন:

  • বিস্ময়কর সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক: তিনি এমন সব সুর তৈরি করেছেন, যা অসমীয়া এবং বাংলা সংগীতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
  • গীত রচয়িতা: তাঁর লেখা গানে ছিল গভীর আবেগ ও জীবনবোধের ছাপ।
  • বহুভাষী শিল্পী: শুধু অসমীয়া নয়, তিনি বাংলা, হিন্দি, তামিল, তেলুগু, কন্নড়, মালায়ালাম, মারাঠি, ওড়িয়া এবং আরও অনেক ভাষায় গান গেয়েছেন, যা তাঁর বিশ্বজনীন শিল্পসত্তার পরিচয় বহন করে।
  • চলচ্চিত্র নির্মাতা: তিনি চলচ্চিত্র পরিচালনা ও প্রযোজনাতেও নিজের দক্ষতা দেখিয়েছেন।
  • যন্ত্রশিল্পী: তিনি গিটার, ম্যান্ডোলিন, ড্রামস এবং বিভিন্ন ধরনের পারকাশন বাজানোর ক্ষেত্রেও পারদর্শী ছিলেন।

তাঁর মতো মানুষের জীবনের বিচার করতে গেলে কেবল তাঁর অভ্যাস বা দুর্বলতাকে সামনে আনলে চলে না। এটি অনেকটা ফুলের পাপড়ি গুনে গাছকে বিচার করার মতো—যেখানে বৃক্ষের মহত্ত্বকে অস্বীকার করা হয়। যদি কেউ তাঁর মতো নেশা করে তবে সে কি তাঁর যোগ্যতা অর্জন করতে পারবে? কখনোই না। কারণ, তাঁর যোগ্যতা নেশার পাত্রে নয়, তাঁর সৃজনশীলতা, সাহস, এবং মানবতার গভীর পথে নিহিত ছিল। ঠিক যেমন, সৈয়দ মুজতবা আলী মদ খেতেন, কিন্তু তাঁর মূল পরিচয় ছিল তাঁর তীক্ষ্ণ মেধা, রসাত্মক রচনাশৈলী এবং সাহিত্যকর্মের জন্য।

 

সৈয়দ মুজতবা আলী: নেশা ও পাণ্ডিত্যের নিরিখ

সৈয়দ মুজতবা আলীর জীবন-চরিত্রেও আমরা এই একই দ্বিমুখী চিত্র দেখি। তাঁর মদ্যপানকে ঘিরে প্রচলিত ঘটনাগুলোও তাঁর অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব ও পাণ্ডিত্যকেই প্রমাণ করে। যেমন:

একবার এক সাংবাদিক তাঁকে মদের আসরে মদ পান করতে দেখে যখন তরুণ সমাজের উপর এর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, তখন রসিক মুজতবা আলী মদের গ্লাসে চুমুক দিয়ে উত্তর দিয়েছিলেন, “তোমার তরুণ সমাজকে বলে দিও—মদ খাওয়ার আগে আমি পৃথিবীর ২৩টি ভাষা রপ্ত করেছি।” আমি বলতে চাই, এই একটি উত্তরেই তিনি স্পষ্ট করে দেন, তাঁর জ্ঞানের পরিধি ও অর্জন তাঁর ব্যক্তিগত অভ্যাসকে ছাড়িয়ে বহুগুণ বড় ছিল।

আবার, মদ্যপানের করুণ পরিণতি সম্পর্কে তিনি যে সচেতন ছিলেন, তার প্রমাণ মেলে তাঁর বন্ধু প্রমথনাথ বিশীকে সতর্ক করার ঘটনায়। একবার সামান্য বিয়ার পান করায় তিনি বন্ধুর পা জড়িয়ে ধরে কাতরভাবে বলেছিলেন, “না খেলে আমি থাকতে পারি না! আমি শেষ হয়ে গেলাম!!!” আমি অনুভব করি, এই অনুতাপ থেকেই বোঝা যায়, তিনি এই নেশাকে কখনোই যোগ্যতার মাপকাঠি হিসাবে দেখেননি, বরং একে ব্যক্তিগত দুর্বলতা মনে করতেন।

 

প্রেরণা হোক তাঁদের কর্ম

যদি কেউ জুবিন গার্গ বা সৈয়দ মুজতবা আলীর মতো মানুষের নেশা বা দুর্বলতার দিকটি নিয়েই শুধু সমালোচনায় মুখর হন, তবে আমি মনে করি, তিনি তাঁদের অমূল্য গুণাবলীকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন। আমি বলতে চাই, আমাদের উচিত তাঁদের নেশা বা দুর্বলতার কারণ নিয়ে বিতর্ক না করে, তাঁদের জীবন ও কর্ম থেকে প্রেরণা নেওয়া। মৃগী রোগ বা ব্যক্তিগত বেদনা সত্ত্বেও জুবিন গার্গ যে বিশাল সৃজনশীল অবদান রেখে গেছেন, বা ব্যক্তিগত অভ্যাস থাকা সত্ত্বেও মুজতবা আলী যে বিপুল জ্ঞান ও সাহিত্যকর্ম রেখে গেছেন—এইগুলোই একজন মানুষকে মহৎ করে তোলে, আর এই গুণগুলোই কালজয়ী হয়ে থাকে।

নেশা এক ব্যক্তিগত দুর্বলতা হতে পারে, যা অনেক সময় জীবনের কঠিন আঘাতের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু সেই দুর্বলতা একজন মানুষের মূল পরিচয় হতে পারে না। আমি অনুভব করি, মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝার চেষ্টা করা উচিত, কেন একজন মানুষ এমন পথে হাঁটে। কিন্তু এর চেয়েও বেশি জরুরি, সেই পথের যাত্রীর উদ্দেশ্য ও অবদানকে সম্মান জানানো।

-লেখক: কবি, সাংবাদিক, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী

Please Share This Post in Your Social Media

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর
All rights reserved © 2013- 2026