দিনাজপুরের বীরগঞ্জে সেবার আড়ালে গড়ে ওঠা একটি চিকিৎসাকেন্দ্র যেন সাধারণ মানুষের কাছে এখন আতঙ্কের অন্য নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুক্রবার ৩ এপ্রিল রাতে বীরগঞ্জ-খানসামা রোডের মোকছেদ প্লাজায় অবস্থিত ‘বীরগঞ্জ ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে’ ভুল চিকিৎসায় এক প্রসূতির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় পুরো এলাকা। অভিযোগ উঠেছে, অদক্ষ চিকিৎসক, নিম্নমানের যন্ত্রপাতি আর চরম অব্যবস্থাপনার কারণে সমেজা বেগম নামের ২৬ বছর বয়সী এক নারীর প্রাণ অকালেই ঝরে গেছে। সমেজা বেগম পার্শ্ববর্তী কাহারোল উপজেলার সরঞ্জা গ্রামের আব্দুর রাজ্জাকের স্ত্রী। এই ঘটনার পর উত্তেজিত জনতা ক্লিনিকে ভাঙচুর চালিয়ে সাইনবোর্ড নামিয়ে অগ্নিসংযোগ করে এবং বীরগঞ্জ-দেবীগঞ্জ সড়ক অবরোধ করে রাখে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে হিমশিম খেতে হয় এবং শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্লিনিকটিকে সীলগালা করে দেওয়া হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় শুক্রবার বিকেল ৩টায়, যখন প্রসব বেদনা নিয়ে সমেজা বেগমকে ওই ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। বিকেল ৫টার দিকে ডা. বকুল হোসেন অস্ত্রোপচার করেন এবং অ্যানেস্থেশিয়ার দায়িত্বে ছিলেন ডা. শরিফুল ইসলাম। অপারেশনের পর একটি সুস্থ কন্যাসন্তানের জন্ম হলেও প্রসূতির অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে পড়ে। স্বজনদের অভিযোগ, ভুল চিকিৎসা ও চিকিৎসকদের অবহেলায় সমেজা বেগমের মৃত্যু হলেও ক্লিনিক মালিক বেলাল হোসেন ঘটনা ধামাচাপা দিতে তৎপর হয়ে ওঠেন। তিনি তড়িঘড়ি করে একটি মাইক্রোবাস ভাড়া করে মৃতপ্রায় প্রসূতি, তার স্বজন এবং অভিযুক্ত দুই চিকিৎসককে দিনাজপুর জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসকরা সমেজাকে মৃত ঘোষণা করেন। এই খবর পাওয়ার সাথে সাথেই ডা. বকুল ও ডা. শরিফুল সেখান থেকে কৌশলে সটকে পড়েন। এদিকে বীরগঞ্জে ক্লিনিক মালিক বেলাল হোসেন অন্যান্য রোগীদের সরিয়ে দিয়ে এবং স্টাফদের নিয়ে ক্লিনিকে তালা ঝুলিয়ে পালিয়ে যান।
মৃত্যুর খবর বীরগঞ্জে পৌঁছালে স্থানীয় লোক ও নিহতের স্বজনদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। শত শত মানুষ ক্লিনিকের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। এক পর্যায়ে উত্তেজিত জনতা ভবনের নিচতলায় থাকা ল্যাবরেটরিতে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। ক্ষুব্ধ জনতা ক্লিনিকের সাইনবোর্ড নামিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে সড়কে অবস্থান নিলে বীরগঞ্জ-দেবীগঞ্জ রুটে প্রায় আধ ঘণ্টা যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। স্থানীয়দের দাবি, এই ক্লিনিকটি দীর্ঘদিন ধরেই একটি ‘কসাইখানা’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এর আগেও এখানে একাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে এবং ভুল চিকিৎসার কারণে অনেক রোগী পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। এমনকি এই ক্লিনিক ও অভিযুক্ত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে আদালতে একটি মামলাও (মামলা নং ৪১০) চলমান রয়েছে। অভিযোগ আছে, জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তদারকির অভাবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় এই ধরণের নিম্নমানের ক্লিনিকগুলো সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার সাহস পাচ্ছে।

ঘটনার খবর পেয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) দীপংকর বর্মন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বীরগঞ্জ সার্কেল) শাওন কুমার এবং বীরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তারা বিক্ষুব্ধ জনতাকে শান্ত করার চেষ্টা করেন এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। সে সময় উপস্থিত জনতা ও গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে সহকারী কমিশনার দীপংকর বর্মন বলেন, একটি সম্ভাবনাময় প্রাণের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক। বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হবে এবং আপাতত জনস্বার্থে ক্লিনিকটি সীলগালা করা হলো। তবে এত বড় ঘটনার পরও একটি রহস্য দানা বেঁধেছে। প্রসূতির লাশ নিয়ে আসার পর শহরে এতো উত্তেজনা ও ভাঙচুর হলেও নিহতের বাবা বা স্বজনরা কোনো লিখিত অভিযোগ না করেই লাশ নিয়ে কাহারোলে ফিরে গেছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তারা সংবাদিকদের জানান, এখন তাদের কথা বলার মতো মানসিক অবস্থা নেই এবং তারা কোনো আইনি ঝামেলায় জড়াতে চান না।
রাত ১১টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে এবং পরিস্থিতি থমথমে থাকলেও প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পলাতক মালিক বেলাল হোসেন বা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে সাধারণ মানুষের একটাই দাবি, বারবার প্রাণ কেড়ে নেওয়া এই ‘কসাইখানা’ যেন আর কখনো মানুষের জীবন নিয়ে ব্যবসা করার সুযোগ না পায়।