আই জামান চমক: করতোয়ার জল যখন শীতে স্থির হয়ে আসে, তখন তার বুকের ভেতর একটা নিস্তব্ধতা থাকে — বাইরে থেকে মনে হয় মৃত, কিন্তু ভেতরে স্রোত বয়ে চলে। বাংলাদেশের রাজনীতিও আজ সেই করতোয়ার মতো — উপরে কথার ঢেউ, ভেতরে প্রতিহিংসার টান।
পঞ্চগড়ের মাটিতে বড় হওয়া মানুষ হিসেবে আমি জানি — এই অঞ্চলের মানুষ কাউকে সহজে নেতা মানে না। যাকে মানে, বারবার মানে। নূরুল ইসলাম সুজনকে এই মাটির মানুষ চারবার সংসদে পাঠিয়েছে — ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে। এই বিশ্বাস একদিনে তৈরি হয় না, আর একদিনে মুছেও যায় না।
আমি তাঁর দলের রাজনীতির সমর্থক নই। আওয়ামী লীগের শাসনের অনেক কিছু নিয়েই আমার আপত্তি আছে, ছিল এবং থাকবে। কিন্তু ন্যায়বিচারের প্রশ্নটা দলের চশমা দিয়ে দেখলে চলে না — সেটা দেখতে হয় বিবেকের আলোয়।
সুজন সাহেবের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ যা শোনা যেত তা ছিল — তিনি জামায়াত-শিবির ও বিএনপিকে অতিরিক্ত আশ্রয় দিতেন। রাজনৈতিক বিবেচনায় সেটা তাঁর দলের অনেকের কাছেই অপরাধ ছিল। কিন্তু মানুষ হত্যার অভিযোগ? এই অভিযোগ শুনে পঞ্চগড়ের সেই মানুষও অবাক হয়, যে সুজন সাহেবকে একসময় ভোট দেয়নি।
আরিস্টটল বলেছিলেন, ন্যায়বিচার মানে সমান মানুষকে সমানভাবে দেখা। কিন্তু বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর যে বিচার শুরু হয়, তাতে প্রায়ই দেখা যায় — ক্ষমতার রং বদলায়, প্রতিহিংসার রং বদলায় না।
২০২৪-এর অভ্যুত্থানের চেতনা আর প্রতিহিংসার রাজনীতি — এই দুটো এক জিনিস নয়। বরং এ দুটো পরস্পরের বিপরীত।
যে মানুষটি ব্যক্তিগতভাবে কারো ক্ষতি করেননি — যাঁর বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ দেশের একজন সচেতন মানুষ দুরে থাক কোনো পাগলও বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন না — তাঁকে মাসের পর মাস কারাগারে রেখে বারবার রিমান্ডে নেওয়া কি বিচার, নাকি শাস্তি? এই প্রশ্নটা আমাদের করতেই হবে।
মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার জনক বঙ্গবন্ধু নিজে বলেছিলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় অর্জন। সেই আইনের শাসন কি তখনই কার্যকর, যখন আমাদের পক্ষের মানুষের জন্য প্রযোজ্য হয়?
জামিন একটি সাংবিধানিক অধিকার। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে একজন মানুষ নির্দোষ — এটাই সভ্য বিচারব্যবস্থার ভিত্তি। নূরুল ইসলাম সুজন একজন প্রবীণ আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। আইনের ভাষা তিনি জানেন। তবুও তাঁকে কি সেই আইনের আশ্রয় পেতে দেওয়া হচ্ছে?
পঞ্চগড়ের মাটি, দেবীগঞ্জের মানুষ, করতোয়ার স্রোত — এই সবকিছু সাক্ষী থাকে। ইতিহাস একদিন হিসাব নেয়। আজ যারা বিচারের নামে প্রতিহিংসা চালাচ্ছেন, কাল তাঁদেরও একই প্রশ্নের মুখে দাঁড়াতে হবে।
ন্যায়বিচার যদি শুধু একটি দলের জন্য হয়, তাহলে সেটা বিচার নয় — সেটা ক্ষমতার খেলা। আর এই খেলায় বাংলাদেশ বড় বেশিবার হেরেছে। এবার কি একটু ভিন্নভাবে ভাবা যায় না?
লেখক: সাংবাদিক, কবি, কথাসাহিত্যিক, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী।