1. info2@icrbd24.com : বার্তা বিভাগ : বার্তা বিভাগ
  2. admin@icrbd24.com : admin :
মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬, ১১:৪৬ অপরাহ্ন
শুভ জন্মদিন

তিস্তার কূলের মানুষটি: রফিকুল ইসলাম সাবুল

আই জামান চমক, ঢাকা
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩ মার্চ, ২০২৬

তিস্তা শুধু একটি নদীর নাম নয় — এই নদীর বুকে যে স্রোত বয়ে চলে, সেই স্রোতের মতোই কিছু মানুষ থাকে, যাদের থামানো যায় না। যারা ছুটে চলে মানুষের কাছে, মাটির কাছে, সত্যের কাছে। ঘাঘটের দুই কূল জুড়ে যখন কুয়াশা নামে ভোরবেলায়, তখনো যে মানুষটি বেরিয়ে পড়েন খবরের সন্ধানে — সেই মানুষের নাম রফিকুল ইসলাম সাবুল।

সাবুল ভাইকে আমি চিনি প্রায় চৌদ্দটি বছর ধরে। চৌদ্দ বছর কম সময় নয় — এই সময়ে নদীর গতিপথ বদলায়, মানুষের মন বদলায়, সম্পর্কের রং বদলায়। কিন্তু যে মানুষটিকে আমি প্রথম দিন যেভাবে দেখেছিলাম, আজও তিনি ঠিক সেই রকম — নিরহংকারী, নির্লোভ, সরল। এই যুগে, যেখানে একটুখানি পরিচিতি পেলেই মানুষ আকাশে উড়তে চায়, সেখানে সাবুল ভাই মাটিতে পা রেখে হাঁটেন। তাঁর পদতলে মাটির গন্ধ — সেই গন্ধ আমাকে টানে।

বেতগাড়ী বাজারের চায়ের দোকানে একটি দৃশ্য আমি বারবার দেখেছি। প্রতিদিন সকালে ও রাতে কিছু মানুষ এসে বসে থাকে — শুধু তাঁর কথা শোনার জন্য। ভাবুন একবার — এই যন্ত্রসভ্যতার ব্যস্ত পৃথিবীতে, যেখানে মানুষ নিজের কথা বলতেই ব্যস্ত, সেখানে অন্যের কথা শুনতে মানুষ অপেক্ষা করে বসে থাকে। এটা কি সামান্য অর্জন? নজরুল বলেছিলেন, “মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।” সাবুল ভাই সেই মহত্ত্বকে বেঁচে রেখেছেন নিজের ভেতরে।

তিনি শুধু সাংবাদিক নন — গীতিকার, সুরকার, কণ্ঠশিল্পী। আর ইসলামী সংগীতে তাঁর যে জনপ্রিয়তা, তা এই দেশের সীমানা পেরিয়ে বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। যে কণ্ঠ মানুষের বুকে ঈমানের আলো জ্বালায়, সেই কণ্ঠের মালিক যদি একই সাথে মাঠে ঘুরে মানুষের কষ্টের কথা লেখেন — তবে তাঁকে কী বলব? শুধু বলি, তিনি বিরল।

রংপুর শহর, গঙ্গাচড়া, বদরগঞ্জ, মিঠাপুকুর — এইসব নামের সাথে মিশে আছে আমাদের একসাথে কাটানো অনেক দিন আর অনেক রাত। একই বাইকে ছুটে চলেছি — দিন পেরিয়ে মধ্যরাত অবধি। আহার করেছি একসাথে, হেসেছি, তর্ক করেছি। আমি বদমেজাজী, ক্ষ্যাপাটে, পাগলাটে মানুষ — এ কথা আমি নিজেই স্বীকার করি। আমাকে বহন করা সবার কম্ম নয়। কিন্তু সাবুল ভাই বরাবর আমাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। তিনি আমার বড় ভাইয়ের মতো হলেও শ্রদ্ধায় তিনি আমার কাছে পিতার সমান। আবার বন্ধুত্বে — একেবারে কাঁধে কাঁধ।

দূরে এসে বুঝেছি, কাছে থাকতে যতটুকু কাছে পেয়েছিলাম, দূরত্বে সেই নৈকট্য আরো গভীর হয়। সেবার ঢাকায় এলেন, দেখা হলো না। আমার অভিমান, আমার অকারণ ক্ষোভ, হয়তো মনের কিছুটা অসুস্থতা — এইসব মিলিয়ে একটা দেওয়াল তৈরি হয়ে গেল। কথা ছিল ঈদের পরে সারাদিন বসব দুজনে, বলব সেই পাথর-জমাট কথামালা। কিন্তু দুই মাস একই বাইকে ছুটেও সেই বসা হয়নি।

তাঁর সম্পর্কে একটি কথা না বললে এই লেখা অসম্পূর্ণ থাকবে। তিনি সবসময় তাঁর ব্যাগে কিছু চিকিৎসা-যন্ত্রপাতি বহন করেন। আমি একসময় ভাবতাম এটা বাহুল্য — অতিরিক্ত বোঝা। কিন্তু জীবন শিক্ষা দেয় ধীরে ধীরে, নদীর মতো — নীরবে, গভীরভাবে। আমার পরিবারে এমন সময় এসেছে, যখন সনামধন্য চিকিৎসকদের দেওয়া ওষুধেও কাজ হয়নি। সেই দুর্বিষহ মুহূর্তে সাবুল ভাইয়ের পরামর্শ মেনে চললাম — আর ফলাফল এলো ম্যাজিকের মতো। আমি বিস্মিত হয়েছি, কৃতজ্ঞ হয়েছি। আমার সন্তান, আমার স্ত্রী, আমি — তিনজনই তাঁর কাছে ঋণী। এই ঋণ শোধ হওয়ার নয়। মানুষের ভেতরে যখন সত্যিকারের মঙ্গলচিন্তা থাকে, তখন তার স্পর্শে নিরাময় আসে — এটা আমি বিশ্বাস করতাম না আগে, এখন করি।

অনেক কথা জমে আছে। অনেক অশ্রুও। তবু জীবন থেমে থাকে না। সাবুল ভাই, আপনাকে একটা কথা বলি — চাপ নিয়েন না। আনাস (রহঃ)-এর বিষয়টা ফাইনাল করে এসেছি। আর আপার বিষয়টাও হবে — যদি তিনি খরচা দেন। এই যে টুকরো টুকরো জীবনের কথা, এই যে অসমাপ্ত কাজের ফিরিস্তি — এইসবই তো আমাদের সম্পর্কের ভেতরের সুর। বাইরে থেকে কেউ বুঝবে না, বোঝার দরকারও নেই। যারা একই বাইকে মধ্যরাত পর্যন্ত ছুটেছে, তাদের ভাষা আলাদা — সেই ভাষায় চাওয়া আর দেওয়া দুটোই অকৃত্রিম।

আগামীকাল তাঁর জন্মদিন। এই মাটির পৃথিবীতে এমন মানুষের জন্মদিন আসলে শুধু একজনের উৎসব নয় — এটা তাঁকে ঘিরে থাকা সকলের উৎসব। দোয়া করি, এই সাহসী মানুষটি সুস্থ থাকুন, দীর্ঘজীবী হোন। তিস্তা যেমন বহমান থাকে যুগের পর যুগ, তেমনি তাঁর কলম, তাঁর কণ্ঠ, তাঁর মানবিক স্পর্শ — বহমান থাকুক আরো অনেক দিন।

আবার দেখা হবে। কথা হবে। গান শুনব। সেই অপেক্ষায় বুক বেঁধে আছি। ভালো থাকুন, আমার মৃত্তিকার অহংকার — সাবুল ভাই।

লেখক: সাংবাদিক, কবি, কথাসাহিত্যিক, আবৃত্তিকার ও বাচিক শিল্পী।

Please Share This Post in Your Social Media

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর
All rights reserved © 2013- 2026